আদালত

আদালত খোলার সিদ্ধান্তে আইনজীবীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। এই পরিস্থিতিতে আগামী সপ্তাহ থেকে দুদিন সীমিত পরিসরে দেশের আদালতসমূহ চালুর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতির আদেশক্রমে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল আলী আকবর সীমিত পরিসরে আদালত খোলার বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেন। আদালত খোলার এই সিদ্ধান্তে আইনজীবীরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কেউ কেউ আতঙ্কও প্রকাশ করেছেন।

এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করছেন আইনজীবীরা। আইনজীবী আশরাফুল আলম তার ফেসবুকের ওয়ালে লিখেছেন, ‘করোনাভাইরাসে সর্বোচ্চসংখ্যক ব্যক্তি আক্রান্তের খবর এসেছে আজ। গত ২৪ ঘণ্টায় মোট আক্রান্ত ৫০৩ জন। আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ অনুমান করা যায়। ঠিক এই মুহূর্তে দেশের নিম্ন আদালত ও উচ্চ আদালত সীমিত পরিসরে চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মাননীয় প্রধান বিচারপতি। অবশ্য কিছুসংখ্যক আইনজীবীও আদালত সীমিত পরিসরে চালুর আবেদন করেছিলেন। বোঝা যায় ইতিহাস সৃষ্টির জন্য কিছু লোক সবসময়ই অগ্রগামী ভূমিকা পালন করে। ইতিহাসে নাম লেখানোর জন্যই তারা এটা করেছেন। ইতিহাস হয়ে থাকবেন। পৃথিবীর যত দিন থাকবে ততদিন এই সিদ্ধান্ত নেয়া ব্যক্তিরা ইতিহাস হয়ে থাকবেন।’

আইনজীবী জাকির হোসেন খান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন, ‘যেখানে নামাজের জন্য মসজিদে যেতে দেয়া হচ্ছে না, স্কুল-কলেজ, হাট-বাজার সবই বন্ধ সেখানে কোর্ট খুলে মহামারি ডেকে আনার উদ্দেশ্য কী? আমরা সবাই জানি কোর্ট মানে শুধুমাত্র আইনজীবী আর বিচারক নন। এর সঙ্গে রয়েছে কোর্ট স্টাফ, ক্লার্ক, বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বিচারপ্রার্থী। আর ফি এর সঙ্গে পুরো আইনজীবী পরিবারের জন্য করোনা ফ্রি। আচ্ছা আর কয়েকটা দিন ধৈর্য ধরলে খুব কি কষ্ট হয়ে যাবে? যেখানে সারা পৃথিবীর মানুষ মাসের পর মাস লকডাউনে আছে সেখানে এক মাসে আমাদের কেনো এত অস্থিরতা!’

আইনজীবী আসাদুল হক আশিক তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আদালত সপ্তাহে দুই দিন না খুলে, অনলাইনে জামিন আবেদন গ্রহণ এবং ভার্চুয়াল জামিন শুনানি করা যেতে পারে। সপ্তাহে দুই দিন খোলা রেখে আদালতে পাঁচ দিনের চাপ সামলাবে কীভাবে? আর সামাজিক দূরত্ব সে তো অনেক দূরের কথা। গার্মেন্টস মালিকদের মতো মাননীয় প্রধান বিচারপতি মহোদয়কে যেন পরে পস্তাতে না হয়। আইনজীবী সমাজের মৃত্যুর মিছিলের দায়ভার কে নেবে? সবার শুভ বুদ্ধির উদয় হোক।’

আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ আদালত খোলার প্রতিবাদ জানিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন ,‘আজ ৫০৩ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। তবুও কী আদালত চালু করতে হবে।’

আইনজীবী জাহাঙ্গীর আলম লিখেছেন, ‘ব্যক্তিগত স্বার্থে কোর্ট খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

আইনজীবী ইকতান্দার বাপ্পী তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘অংশিক কোর্ট খুলে শুধুমাত্র জামিন বাণিজ্য করার সুযোগ দিয়ে বাধিত করবেন…অন্যরা রেশন খেয়ে বাঁচবে।’

আইনজীবী জাহিরুল ইসলাম খান তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘পত্রিকার নিউজ পড়ে ও তাদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছি ১৪ জন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শুধুমাত্র এক বা একাধিক ‘ভার্চুয়াল আদালত’ এর জন্য মাননীয় প্রধান বিচারপতির নিকট আবেদন করেছেন। অন্য কিছু নয়। এ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি না করাই ভালো। কারণ এদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে আমি নিশ্চিত যে, এভাবে কোর্ট খোলার বিরুদ্ধে তারা অবস্থান নিয়েছে। এভাবে কোর্ট খোলার পক্ষে তেমনভাবে কাউকেই দেখছি না।’

সীমিত পরিসরে সপ্তাহে দুদিন চলবে আদালত

করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আগামী ৫ মে পর্যন্ত দেশের সব আদালত ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রত্যেক জেলা ও দায়রা জজ এবং মহানগর এলাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতকে সুবিধামতো প্রতি সপ্তাহের যেকোনো দুই দিন কঠোরভাবে সামাজিক দূরুত্ব বজায় রেখে জরুরি জামিন শুনানির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) প্রধান বিচারপতির আদেশক্রমে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল আলী আকবর একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছেন।

এতে বলা হয়, চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নিজে অথবা তার নিয়ন্ত্রণাধীন এক বা একাধিক ম্যাজিস্ট্রেট ছুটির সময়ে সুবিধামতো প্রতি সপ্তাহের যেকোনো দুই দিন কঠোরভাবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে জরুরি জামিন শুনানির (কারাগারে থাকা হাজতি আসামির আবেদনসহ) জন্য সীমিত আকারে আদালতের কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা গ্রহণে নির্দেশ দেয়া হলো।

এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের গত ১১ এপ্রিলের নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় পুনরায় উল্লেখ করা হচ্ছে, যেসব ফৌজদারি মামলায় আসামিকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জামিন প্রদান করা হয়েছে বা যেসব মামলায় উচ্চ আদালত হতে অধস্তন আদালতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণের শর্তে জামিন প্রদান করা হয়েছে বা যেসব মামলায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা/স্থিতাবস্থা/স্থগিতাদেশের আদেশ প্রদান করা হয়েছে, সেসব মামলার আদেশের কার্যকারিতা আদালত নিয়মিতভাবে খোলার তারিখ হতে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত বর্ধিত হয়েছে বলে গণ্য হবে। সাধারণ ছুটির সময়ে মামলাগুলোর বিষয়ে কোনো আবেদন শুনানির জন্য গ্রহণ করা হবে না।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, একটি মামলার জামিন শুনানিতে শুধু একজন আইনজীবী অংশগ্রহণ করবেন। আদালত প্রাঙ্গণে এবং এজলাস কক্ষে সামাজিক দূরত্বের নিয়মকানুন কঠোরভাবে অনুসরণ করা না হলে আদালতের কার্যক্রম স্থগিত করতে হবে। আদালত প্রাঙ্গণে এবং এজলাস কক্ষে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়ে স্ব স্ব আইনজীবী সমিতির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং কার্যকরী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে জেলা ও দায়রা জজ/মহানগর দায়রা জজ প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করবেন।

এছাড়া বিজ্ঞপ্তিতে জামিন শুনানিকালে করাগারে থাকা অসামিদের প্রিজনভ্যান বা অন্য কোনোভাবে আদালত প্রাঙ্গণে ও এজলাস কক্ষে হাজির না করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও চারজন প্রাণ হারিয়েছেন। এতে ভাইরাসটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ১৩১ জনে। আক্রান্ত হিসেবে নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন আরও ৫০৩ জন। ফলে দেশে করোনাভাইরাসে মোট আক্রান্তের সংখ্যা হয়েছে চার হাজার ৬৮৯ জনে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.