আমাদের চাঁদপুরে পদ্মা-মেঘনার দুই সোনা সম্পদ এবং…

ইকবাল হোসেন পাটোয়ারী ::
এই যে আমাদের পদ্মা আর এই যে মেঘনা, কতো লক্ষ কোটি সম্পদ তাদের – এর হিসাব বোধকরি অসীম বল্লেও ভুল হবে না। যদি আমি চাঁদপুরের ৭০ কিলোমিটার নদী অঞ্চলও ধরি, সেখানে এর সম্পদ মধ্যপ্রাচ্যের একটা সোনার খনির সাথে তুলনা করি, তাহলে বোধহয় সেটা ভুল বলা হবে না!
প্রশ্ন জাগতেই পারে যে কারো, কি এমন সম্পদ এর পেটে?
শুনুন তাহলে!


আমরা জানি, এই সুবিশাল নদী অঞ্চলে অবাধে বিচরণ করে মাছের রাজা ইলিশ।! আমাদের জাতীয় মাছ। শুধুই কী ইলিশ? না, এই নদী অঞ্চলে পাওয়া যায় লাখো কোটি পাংগাস, আইড়, রুই, কাতলা, বোয়াল, কোরাল, কালি বাওশ, চিতল, রিটা, বাইলা পোয়াসহ নানা সুস্বাদু মাছ। কার্তিক থেকে শুরু করে ফাল্গুনে পাংগাসসহ এসব বড় বড় মাছ জেলেদের জালে ধরা পড়ে, নয়তো চাঁই কিংবা বরশিতে। এছাড়াও পুরো বছর জুড়েই এসব মাছের বিচরণ এই পদ্মা আর মেঘনা অন্চলে। এটি স্থানীয় বিশেষ করে নদী ঘেষা জেলা শহর আর হাইমচর এবং মতলবের মানুষ জানে। জানে মৎস বিভাগ আর মৎস্য গবেষনা ইনস্টিটিউটের লোকেরা, প্রশাসন। কিন্তু কতো পরিমান মাছ ইলিশ এই নদী অন্চলে আহরন হয়, তার সরকারি হিসাব নাই! মৎস্য বিভাগ এর কোন প্রকৃত হিসাব রাখে না।! কালেভদ্রে সংবাদকর্মীরা চাইলে যবোথবো হিসাব একটা দিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু এই মৎস্য সম্পদ চাঁদপুরে এতো সুবিশাল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধতায় পরিপূর্ণ, সেটা অজানাই থেকে যায়। মজার ব্যাপার – এখানের জেলেরা ইলিশ ধরে, কিন্তু এই অঞ্চল মানে চাঁদপুর থেকে কতো ইলিশ শিকার হয় প্রতি বছর, তার হিসাবও গোঁজামিলের! সারা দেশের ইলিশের সাথে এর হিসাব মিলায়ে যায় বেশির ভাগ সময়ে। এখানের নদী তীরবর্তী মানুষের হিসাব, মাছ ব্যবসায়ীদের হিসাব এবং ধারনা – মা ইলিশ ধরার ২২ দিন আর জাটকা নিধনরোধে নিষেধাজ্ঞার ২ মাস বাদ দিলে বাকি সাড় ৯ মাস কমপক্ষে ইলিশ এবং অন্যান্য মাছ শিকার হয় প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার উপরে। প্রায় ৬০ হাজার জেলে মাছ শিকার করার সাথে সম্পৃক্ত থাকে ৭০ কিলোমিটার পদ্মা,মেঘনায়। সংশ্লিষ্ট এবং জেলেরা মনে করে- বাপ দাদার আমল থেকে অর্থাৎ শত সহস্র বছর ধরে যে সনাতনী পন্থায় জেলেরা মাছ শিকার করে সেটা আজও চলমান! অথচ পাশের দেশ ভারত অথবা চিন, জাপান, কুরিয়াসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই নদী থেকে কাঙ্খিত পরিপক্ক মাছ তুলে আনার জন্য অনেক আধুনিক উপকরণে জেলেদের মাছ শিকার করতে দেখা যায়। এ প্রসঙ্গে একজন মৎস বিজ্ঞানী আমায় বলছেন, হ্যাঁ আমাদের জেলেরা যদি আধুনিক উপকরণ এবং মাছ ধরায় আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং মাছ ধরা বিষয়ে প্রশিক্ষন পেতো, তাহলে আমাদের মাছ আহরন আরো বেশি হতো। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের জেলদের অফ সিজনে খাদ্য সাহায্যের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ দেয়া হয় হাঁসমুরগি কিংবা পশুপালন বা অন্য কোন কর্মসংস্থান বিষয়ে। কিন্তু কখনোই মাছ ধরা বিষয়ে প্রশিক্ষণ বা আধুনিক যন্ত্রপাতি তাকে দেয়া হয় না। যার ফলে অধিকাংশ সময়ই অধিকাংশ জেলেকে বলতে শুনা যায় সারাদিন জাল বাইলাম, বরশি বাইলাম কিন্তু সে রকম মাছ পাইলাম না! যাক্ আশা করি বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টরা গবেষণা করবেন। বিশেষ করে একটি পাইলট প্রজেক্ট হিসাবে চাঁদপুরের এই বিশাল পদ্মা মেঘনা অন্চল দিয়ে শুরু করা যায় এ ধরনের কর্মকাণ্ড। আর এটি যদি বাস্তবায়ন হয়, তাহলে আশা করতে পারি, এখানে সিজনেও একথা শুনা যাবে না যে, ইলিশ বা অন্য মাছ মিলে না। আর দ্বিগুন পরিমান মাছ আহরিত হবে।
শুুরুতেই বলেছিলাম, চাঁদপুরের ৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা মেঘনা সম্পদে পরিপূর্ণ। এটিতো গেলো মাছের হিসাব! আর আরেকটি অগাধ সম্পদ হচ্ছে এর তলদেশের বালু এবং চরের বেলে এবং কাঁদা মাটি। এই বালু আর মাটিকে যদি সোনা বলি তাহলে মোটেও ভুল হবে না! বর্ষা কী শুকনো সিজন, সব কালেই এই সোনা মিলছে! আর এই সোনা বিক্রি করে চাঁদপুরের কতিপয় লোক এবং এর আশেপাশের জেলার লোক শত হাজার কোটি এবং তারও বেশি টাকার মালিক হয়ে যাচ্ছেন। কেউ লিজের নামে বালু তুলছেন আবার কেউ এমনি এমনি ম্যানেজ করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, চাঁদপুরের সব সম্পদও যদি শেষ হয়ে যায় তাহলেও বালু বা মাটি সম্পদ শেষ হবে না, হবে না! কারণ বর্ষার পর সারা দেশের যতোগুলো ছোটবড় নদ- নদী আছে সেসবের পানি চাঁদপুরের পদ্মা মেঘনা হয়ে বঙ্গোপসাগরে নামে এবং বর্ষায় অতিরিক্ত যে পানি সাগর গড়িয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রবেশ করে সেটিও চাঁদপুর হয়ে। আর এই আসা যাওয়ার প্রাক্কালে সেই পানির সঙ্গী হয় কোটি কোটি টন বালি আর কাঁদামাটি। স্বচ্ছ সোনালি রূপালি বালি স্তরে স্তরে বসে যায় এখানের নদী গভীরে! আর কাঁদা এবং বেলে মাটি সরে গিয়ে তৈরি করে ছোট বড় অসংখ্য ডুবোচর। বালুর পকেট তৈরি হয় হাজার হাজার! আর তখুনি বালু খেকো মানুষগুলো হুমড়ি খায়। অপরিকল্পিতবাবে ড্রেজার দিয়ে তোলা হয় কোটি কোটি টন বালু, তেমনিভাবে চর কেটে বেচাবিক্রি হয় মাটি।! কাজটি হয় দেদারছে।
চাঁদপুর অন্চলের বালু নির্মান কাজে সালদা বা অন্য কোন নদীর বালুর চেয়েও অনেক ভালো! এটি গত ১০ বছরে আরো উন্নততর হয়েছে, সংশ্লিষ্টদের কথা। এর মাটিও বেশ।
কিন্তু এই সোনালি সম্পদের লাখো ভাগের এক অংশ সরকার পায় কি না সন্দেহ।! বরং সরকারের বিআইডব্লিউটিএ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রায় প্রতি বছরই ড্রেজিং এর নামে কোটি কোটি টাকার কাজ করে। কিন্তু ৬ মাস ঘুরতে না ঘুরতেই এর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। প্রতিবছরই নদী ড্রেজিং শেষেও শুনা যার নদী চ্যানেলে আটকে আছে লঞ্চ না হয় স্টিমার কিংবা মালবাহী দেশি বিদেশী জাহাজ।
কিন্তু এসব যদি সরকার পুরোদমে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিজেরাই পরিকল্পিতভাবে বালু, মাটি উত্তোলন করতো তাহলে চাঁদপুরের বালু আর মাটি বিক্রি করে যে আয় হতো সেটা আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে অনেক ইতিবাচক প্রভাব ফেলতো। বছরে এখান থেকে খরচ বরচ ছাড়াই কমপক্ষে ২ আড়াই লাখ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব! তার মানে এখানের ইলিশসহ সুস্বাদু মাছ এবং বালু ও মাটিতে দেশের প্রায় এক বাজেটের অর্থ না হলেও তার কাছাকাছি হবে!
আমার এই হিসাব কোন সরকারি, বেসরকারি এনজিওর কাগুজ কলমের গদ হিসাব নয়! এ হিসাব সাধারনের! তবে এতে দ্বিমত পোষন করবার মতো লোক যে নেই তা নয়, তবে তাদের সংখ্যা স্বল্প।! তাই বলবো, এই সুবিশাল সম্ভাবনাকে কিভাবে কাজে লাগানো যায়, অর্থাৎ বাস্তবায়ন করা যায়, সেটি নিয়ে আলোচনা গবেষনা জরুরি।
লেখক : সাবেক সভাপতি, চাঁদপুর প্রেসক্লাব, সম্পাদক ও প্রকাশক, চাঁদপুর প্রতিদিন, জেলা প্রতিনিধি দৈনিক সমকাল।

 

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.