করোনার কাছে আমাদের শিক্ষা

অ্যাডভোকেট জেসমিন সুলতানা ::
করোনা তীব্র আঘাত হেনে ধেয়ে আসছে আইনজীবী অঙ্গনে। তাকে প্রতিরোধ করার প্রস্তুতি, সক্ষমতা কি আইনজীবীদের আছে?
গতকাল আসাদের মৃত্যু তীব্র ধাক্কা দিয়েছে আইনজীবীদের। কেননা সে আমাদের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। তাই তার মৃত্যু আমাদের বিবেককে প্রবল ভাবে নাড়া দিয়েছে।
আইনজীবীদের মৃত্যু হয়েছে। তাদের সাথে আমাদের সখ্যতা তেমন ছিলোনা বলে উপলব্ধির দ্বার সেভাবে উন্মোচিত হয়নি। বুঝতে পারিনি যন্ত্রণার তীব্রতা।
গত নভেম্বরে উহান প্রদেশে তীব্র আক্রোশ নিয়ে করোনার আবির্ভাব। কান ধরে সবাইকে ঢুকিয়ে দিলো ঘরে। দৃশ্যপট আমার বিশ্বাস হয়নি। ধুৎ চীনের মানুষ ঘরে ঢুকেছে? পরে একে একে তার আগ্রাসী রূপ গোটা বাঘা বাঘা দেশ তথা গোটা বিশ্বকে যখন মরণপুরীতে পরিনত করে দিচ্ছে। তখন ভীত হতে শুরু হলো মন।
৮ মার্চ আন্তজার্তিক নারী দিবস। অনেক ঘটা করে, যুদ্ধ করে পালন করি আমাদের প্রিয় অঙ্গনে। এবার করা যাবে না। সে তো ঢুকে পড়েছে লুকিয়ে নয় ঢাক ঢোল পিটিয়ে।
” হাক দ্যা ব্লাডি পিপলস ”
তাকে আমরা ভয় পাইনি বার বার নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরও ঘরে বসে থাকিনি। আমরা মানুষ নামের দানবেরা করেছি অত্যাচার পৃথিবীকে। সে আমাদের ফিস ফিস করে বলেছে বন্ধ করো অত্যাচার। স্ব শব্দে বলেছে বন্ধ করো অত্যাচার, চিৎকার করে বলেছে বন্ধ করো অত্যাচার।
আমরা যে মুক, বধির, অন্ধ আমরা মানব জাতি কিছুই দেখেও দেখিনা, শুনেও না শোনার ভান করি। আমরা দিনের পর দিন করে চলেছি পৃথিবীকে বিষাক্ত, বসবাস অযোগ্য। তারও তো সহনের মাত্রা আছে। ভালবাসার সীমা আছে, আরো কতো!
আসলে আমাদের শিক্ষার প্রয়োজন ছিল বলেই আমাদের জাগাতে এসেছে করোনা। আমরা বায়ুকে করেছি দূষিত আকাশ যানে। বিভিন্ন কলকারখানায় জীবাস্ম জ্বালানীর মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার করে পানিকে দুষিত করেছি। বিভিন্ন জাহাজের বর্জ্য, কলকারখানায় বর্জ্য ফেলে। পরিবেশের কথা আর নতুন করে বলার কিছু নেই।
প্রতিশোধ তো নিতেই হবে। আমরা পৃথিবীর ফুসফুস আমাজন রেইনফরেস্ট ধ্বংস করেছি। তাই করোনা আমাদের ফুসফুসে আঘাত হেনেছে। আমরা পৃথিবীকে জ্বালিয়ে রুক্ষ শুষ্ক করে দিয়েছি। তাই করোনা তীব্র জ্বর নিয়ে তার যন্ত্রণা আমাদের বুঝাতে এসেছে। আমরা বাতাসকে দূষিত করেছি। তাই করোনা আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে শ্বাস কষ্টের।
আমরা পানিকে খাওয়ার অনুপযুক্ত করেছি। খাবারে ফরমালিন বিষ মিশিয়ে মানুষকে খাইয়েছি। তাই করোনা এসেছে তীব্র পেট ব্যথা, পেট খারাপ নিয়ে।
আমরা অষ্ট্রেলিয়ার দাবানলের পর বন্যপ্রানীদের কথা কি বেমালুম ভুলে গেলাম। ওদের পুড়ে যাওয়ারী যন্ত্রণা এসেছে শরীরের তীব্র বেদনা নিয়ে। তারপরও আমরা শিক্ষা নেইনি, নিতেও চাই না।
সুন্দর আমরা ভুলে যাই আমাদের বন বনানীকে। বন তার বুক পেতে আমাদের রক্ষা করছে। আমরা বেঈমান, আস্ফালনকরা, দাম্ভিক অকালকুষ্মান্ড এক জাতি, অকৃতজ্ঞতা আমাদের রক্তে, ধ্যানে নেই। তা না হলে পারি আমাদের প্রাণ সুন্দরবনকে উজাড় করে দিতে।
যখন আল্লাহ রাসুলের জন্মস্থান সৌদীআরবে দেখেছিলাম ডিসকো, বেলাল্লাপনা, রিভারক্রুজের নামে নারী পুরুষের অবাধ সংগম, আমাদের দেশেও ক্যাসিনো, দূর্নীতিবাজদের টাকার বাহার তখনই মনে হয়েছিল আর কতো সইবে সৃষ্টিকর্তা বিপদ মনে হয় আসবেই।
বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়ে করোনা আমাদের ঘরে থাকতে বাধ্য করেছে। ঘরে বসে,মৃত্যু দ্বারে ঠক ঠক আওয়াজ দিচ্ছে জেনেও শয়তানী বন্ধ নেই। চাল চুরি, প্রণোদনা চুরি, ঠকবাজী, জিনিসপত্রের দাম বাড়ানো, জোচ্চুরি কিছু বন্ধ নেই।
তবে আকাশ আজ নীল, বাগানের পাখিরা, ফুল ফসলেরা প্রান ভরে দান করে যাচ্ছে। ঘরে বসে উপলব্ধি করছি ধুলোময়লা নেই। আমরা যেন স্বপ্নের নীড়েই আছি। ডলফিনেরা সাগর পাড়ে ভীড় করেছে। লাল কাকড়া হেসে খেলে বেড়াচ্ছে। বন্যপ্রানীরা অরণ্য ছেড়ে এসেছে লোকালয়ে, সবুজে শ্যামলে ছেয়ে গেছে প্রকৃতি, রুদ্র ঝলমলে সকাল মনে হয় তারুণ্যে ভরা এক সুন্দর পৃথিবী রচনা করেছে করোনা।
আসুক প্রবল ঝড়,আসুক বন্যা, আসুক ঘূর্ণন। আমরা মোকাবিলা করতে পারবো। চলে যা করোনা, আমরা তোকে মোকাবিলা করতে পারবোনা। আমরা শক্তিহীন ১৮ কোটি মানুষের পর্যাপ্ত হাসপাতাল নেই। আইসিও নেই। ভ্যানটিলেশান দেওয়ার সামগ্রী নেই। আমরা বড় অসহায় তবে নাদান জাতি।
আইনজীবী ভাইবোনেরা কোথা থেকে দিবো শ্বাস নিঃশ্বাসে জন্য এতো মূল্য। আমি যখন লিখছি ফ্যান লাগছে না। সকালের মৃদুমন্দ নির্মল বাতাস আমার মন প্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছে।
সৃষ্টিকর্তার কাছে কি দিয়ে কৃতজ্ঞতা জানাবো। এ নিঃশ্বাসটুকুর জন্য। আমাকে পয়সা দিয়ে নিতে হলে বিধাতাকে আমি কি টাকা দিয়ে পরিশোধ করতে পারতাম?
আমরা আইনজীবী ভাইবোনেরা একটু ধৈর্য ধরি। আল্লাহ সবার রিজিকের মালিক। তিনি কোনো না কোনোভাবে আমাদের ভালোই রাখবেন। আমাদের পাশে কেউ নেই। আমাদেরই স্বাবলম্বী হয়ে নিজেকেই মোকাবিলা করতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট বারসহ আত্মীয় স্বজন,বন্ধু ভাই বোন সবাই নিরাপদে থাকি।
ভালো থাকুন আর একটি মৃত্যু সংবাদ যেন শুনতে না হয়। আক্রান্ত সবার জন্য দোয়া করি। ক্ষমা চাই। আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন।
লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, সভাপতি, ঢাকাস্থ চাঁদপুর জেলা আইনজীবী কল্যান সমিতি।

শেয়ার করুন

Leave a Reply