চাঁদপুরে নারী কর্মকর্তারা সামলাচ্ছেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব

সকল বাধা পেরিয়ে আলো ছড়াচ্ছেন মাঠ প্রশাসনে
ইব্রাহীম রনি :
সকল প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন নারীরা। সংসার সামলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন তারা। প্রশাসন, বিচার বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাক্ষেত্র, সাংবাদিকতা, কৃষিক্ষেত্রসহ দেশের সকল সেক্টরকে এগিয়ে নিতে নিরলস কাজ করছেন নারীরা। এর ব্যতিক্রম নয় চাঁদপুরও। জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাও একজন নারী। এমনকি এখানের ৮টি উপজেলার মধ্যে ৫টিতেই ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পাঁচজন নারী কর্মকর্তা। বিভিন্ন বিভাগে দায়িত্ব চালকের আসনে রয়েছেন আরও বহু নারী কর্মকর্তা। কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে নিজেকে নারী না ভেবে শুধুমাত্র অর্পিত দায়িত্বটুকুই সুচারুভাবে পালনে গুরুত্ব দেন তারা। অনেক নারী কর্মকর্তা আবার সরকারের স্বার্থ রক্ষায় লোভ-লালসার উর্ধ্বে উঠে প্রভাবশালীদের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতেও দেখা গেছে।
সরকারি বিভিন্ন দফতরে থাকা নারী কর্মকর্তারা বলছেন, সকল বাধা অতিক্রম করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ যেমন এগিয়ে যাচ্ছে, তেমনি পিছিয়ে নেই নারীরাও। মেয়েদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা এবং সচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারলেই নারীরা আরও এগিয়ে যাবে। এক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকাই সবচে গুরুত্বপূর্ণ।
জানা গেল, ডিসি ছাড়াও চাঁদপুর জেলা প্রশাসনে রয়েছেন এক ঝাঁক নারী কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে রয়েছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মোছাম্মৎ রাশেদা আক্তার, সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট (জেনারেল সার্টিফিকেট শাখা ও স্ট্যাম্প অবমূল্যায়ন সেল, জাটকা শাখা) শারমিন আক্তার, সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট (শিক্ষা শাখা) আখতার জাহান সাথী, সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সেলিনা আক্তার, সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট (তথ্য প্রদান ইউনিট) আবিদা সিফাত, সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট (অভিযোগ ও তদন্ত সেল) রেশমা খাতুন, সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট (পর্যটন সেল) রিক্তা খাতুন, সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট (গোপনীয় শাখা) দেবযানী কর।
৫টি উপজেলা প্রশাসন সামলাচ্ছেন চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সানজিদা শাহ্নাজ, ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার শিউলী হরি, হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোমেনা আক্তার, মতলব দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফাহমিদা হক, শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী অফিসার শিরীন আক্তার।
বিচার বিভাগেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন বিজ্ঞ নারী বিচারপতিগণ। জানা গেছে, চাঁদপুরে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের জজ, সহকারী জজসহ অন্তত ছয়জন নারী বিচারক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া করোনাকালে স্বাস্থ্য বিভাগে চিকিৎসাসেবা দিয়ে সুনাম কুড়িয়েছেন অনেক নারী চিকিৎসক। তাদের মধ্যে একজন চাঁদপুর ২৫০ শয্যার সরকারি জেনারেল হাসপাতালে সহকারী পরিচালক ডা. সাজেদা বেগম পলিন। যিনি করোনার ভয়াবহতার সময় রোগী সেবায় অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।
নারীদের অগ্রযাত্রা সম্পর্কে তিনি বলেন, নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু পরিবার অনেক ভাল করছে। আবার অনেক পরিবারের মেয়েরা এখনো পিছিয়ে আছে। কারণ, এখনো অনেক পরিবার অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। হাসপাতালে অনেক রোগী আসে, যাদের বিয়ের বয়স হওয়ার আগেই তারা প্রেগনেন্ট হয়ে যাচ্ছে। অর্ধেকেরও বেশি এমন রোগী আমরা পাই। এটি নারীর প্রতি অসমতার একটি প্রমাণ। তাই সকল পর্যায়ের নারীকেই তার অধিকার দেয়া উচিত। আমরা অল্প কিছু নারী কাজ করার সুযোগ পাবো আর অন্য নারীরা তাদের প্রতিভা বিকশিত করার সুযোগ পাবে না- এটি হওয়া উচিত না।
নারীদের অগ্রযাত্রায় প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গির। ছেলেকে অনেক পড়াবো, মেয়েকে কম পড়ালেখা করাবো, মেয়ে বের হলে রাস্তায় সমস্যা হবে, বাইরে মেয়েরা কিভাবে একা কাজ করবে- এধরনের নানা দৃষ্টিভাঙ্গি থেকে আমাদের সমাজ এখনো পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি। এছাড়া অর্থনৈতিক কিছু ব্যাপার আছে। একজন বাবার উপার্জন কম থাকলে ছেলেকে পড়ায়, মেয়েকে পড়াতে চায় না।
কর্মক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে আমি আমার পরিবার থেকে শতভাগ সাপোর্ট পাওয়ায় কর্মক্ষেত্রে প্রচুর সময় দিতে পেরেছি। তবে আমাকে সব সময় পুরুষ সহকর্মীদের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক থাকতো হয়।
নারীদের উদ্দেশ্যে বলবো- মন থেকে কাজ করলে অনেকের সহযোগিতাই পাওয়া যাবে। কিছু বাধা থাকলেও সেটি অতিক্রম করা যায়। সুতরাং আগ্রহ নিয়ে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা শাহনাজ বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছরে নারীদের অনেক অগ্রগতি হয়েছে। কারণ, দেশ এগিয়ে গেছে। সেই সাথে নারীরাও এগিয়ে যাচ্ছে। বিগত কয়েক বছরের এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে- মেয়েদের পাসের হার ভালো।
তিনি বলেন, আম যেই কর্মপরিবেশে আছি সেখানে নারী হিসেবে প্রতিবন্ধকতা খুব একটা নেই। এখানে নারী-পুরুষ সবাই সমান মর্যাদা পায়।
ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিউলি হরি বলেন, বর্তমান সমাজ অনেক এগিয়ে গেছে। পারিবারিক বা কর্মক্ষেত্রে আমি তেমন কোন বাধার মুখোমুখি হইনি বলেই কাজ করতে পারছি। নারীর অগ্রযাত্রায় প্রতিবন্ধকতা আগের চেয়ে অনেক কমেছে। সব কিছু একবারে পরিবর্তন করা যায় না। আশাকরি, সামনের দিনগুলোতে নারীরা আরও এগিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, সবার আগে পরিবার থেকে এগিয়ে আসতে হবে। পরিবার চাইলে সমাজের বিরুদ্ধে গিয়েও মেয়েদের অনেক সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। মেয়েদের সাহস, অনুপ্রেরণা দিলেই তারা এগিয়ে যাবে।
এদিকে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদানের পর সরকারের শত শত কোটি টাকা রক্ষা, সরকারি সম্পদ রক্ষায় পদক্ষেপ এবং সরকারি সেবা দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছেন অঞ্জনা খান মজলিশ। নারী দিবস উপলক্ষে তিনি বলেন, আমি একজন সরকারি কর্মকর্তা। আার উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাসাধ্য সুচারুভাবে পালন করাই আমার কাজ। আমি নারী কিংবা পুরুষ সেটি কোন বিষয় না। আমি একজন নারী হিসেবে কর্মক্ষেত্রে কোন বাধাও সৃষ্টি করে না।
তিনি বলেন, গত ৫০ বছরে দেশে নারীর ক্ষমতায়নে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর নারীর ক্ষমতায়নে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি নানামুখী উদ্যোগ নেয়ায় নারীরা এখন প্রশাসনসহ সকল ক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। তাই নারীদের আরও অগ্রগতি হওয়া প্রয়োজন। সবাই শিক্ষিত হওয়া এবং তাদের কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। যদি নারীরা শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হয় তখনই সে তার অধিকার ও দায়িত্ববোধ সম্পর্কে সচেতন হবে। তখন নারী নির্যাতন কমে আসবে। দেশ আরও এগিয়ে যাবে। যদিও এখনো কিছু ক্ষেত্রে নারীর অগ্রযাত্রার ব্যাহত করছে কুসংস্কারবোধ, অসচেতনতা এবং শিক্ষার অভাব।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আমার প্রতিটি পরিবারের কাছে আমার আহ্বান, একটি পরিবারে যখন একটি শিশু জন্ম নেয় তখন সে মেয়ে নাকি ছেলে সেটি না দেখে সন্তান হিসেবে দেখা উচিত। আর সেই সন্তানকে বাবা-মায়ের উচিত সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে সচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।
নারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, কর্মক্ষেত্রে নিজেকে একজন মেয়ে হিসেবে চিন্তা না করে একজন মানুষ এবং একজন কর্মচারী বা কর্মকর্তা হিসেবে তার উপর যে অর্পিত দায়িত্ব তা সঠিকভাবে পালন করার মানসিকতা নিয়ে কর্মক্ষেত্রে আসতে হবে। সেই সাথে প্রত্যেক পুরুষ তার সহকর্মীকে নারী হিসেবে না দেখে একজন সহকর্মী হিসেবে যেন দেখলেই সবার জন্য ভালো।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.