চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা (তৃতীয় পর্ব)

সকল প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে সরকার বিভিন্ন সময়ে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ ও সুরক্ষার জন্য প্রচারিত স্বাস্থ্য বিধি মনোযোগ সহকারে হৃদয়ঙ্গম করা এবং যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।
করোনা ভাইরাস সাধারণভাবে নাক/মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে ফুসফুস ধ্বংস করে দেয় । অবশেষে প্রাণবায়ু শেষ হয়ে যায় । করোনার সবচেয়ে বড় শত্রু মাস্ক। ইহা অনেক বড় প্রতিরক্ষাব্যুহ তৈরি করে। মাস্কের কারণে এর জীবাণু শরীরে প্রবেশ করতে পারে না। করোনাভাইরাস হতে বাঁচার জন্য মাস্ক পরার উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এর কোন বিকল্প নাই। মনে রাখা দরকার – মাস্ক কেনা কষ্টসাধ্য হলে পুরনো গেঞ্জি, শার্ট,গামছা পরিষ্কার করে বিকল্প হিসেবে নাক-মুখে ব্যবহার করা যেতে পারে। মোট কথা -ঘরের বাহিরে গেলে নাক- মুখ বন্ধ করার জন্য মাস্ক পারতেই হবে। এই বিষয়টি অনুসরণ করলে করোনার থাবা হতে অনেকটা রক্ষা পাওয়া যাবে।

স্বাভাবিক অবস্থায় ময়লা দূর করতে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হয়। তবে, এ সময়ে কোন জরুরি প্রয়োজনে ঘরের বাহির হলে অবশ্যই যে কোন সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। অনেক দামী বা বিশেষ ব্রান্ডের সাবান ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। বিষয়টি আরও স্পষ্ট করি – করোনাভাইরাসের জীবাণু এতো ক্ষুদ্র যে খালি চোখে এগুলো কখনোই দেখা যায় না। বাহিরে গেলে হাতে জীবাণু চলে আসতে পারে। আর হাতে বহনকারী করোনার জীবাণু খাবারের সঙ্গে ঢুকে গেলে মহা সর্বনাশ। সে জন্য সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে।

সকলের রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা এক রকম না।রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে কেহ কেহ হয়তো আগেই আক্রান্ত হয়েছেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই সুস্থ হয়ে গেছেন অথবা তত অসুস্থতা বোধ করছেন না, ঔষধও খান নাই। তবে, কারো কোন আলামত দেখলে বা থাকলে তাকে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতেই হবে। বাহাদুরি করে কোন রিস্ক নেয়া বোকামি হবে, কাছের মানুষের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হবে। পরিবারের অন্য সদস্যদের থেকে আলাদা থাকা, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখাই ‘আইসোলেশন’।

জীবাণুবাহী কোন ব্যক্তির একবারে নিকটে গেলে/ঘষাঘষি করলে/ ঠেলাঠেলি করে যানবাহনে উঠলে/ চাপাচাপি করে বসলে/ হ্যান্ড শেক করলে/ নাক-মুখের ডগায় বসলে/ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মসজিদে নামাজ আদায় করলে আক্রান্ত হওয়ায় আশঙ্কা অনেক বেশি। এজন্য নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। এসব পরিস্হিতি এড়িয়ে চলতে হবে। এটাই সামাজিক দূরত্ব।

স্বাভাবিক অবস্থায়ও হাঁচি-কাশি আসতে পারে। তবে, করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ভালো মানুষও আক্রান্ত হতে পারে। কেননা, হাঁচির স্পিড দুই/তিন ফুট পর্যন্ত হয়। এজন্য ১) মাস্ক পরা, ২) হাত ধোঁয়া এবং ৩) সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মৌলিক কাজটি বিনা ব্যর্থতায় অবশ্যই প্রতিপালন করতে হবে।

একান্ত বাধ্য না হলে অযথা বাঁদুর ঝোলা বা ঠেলাঠেলি করে ভ্রমণ/ আত্মীয় স্বজন/ বন্ধু-বান্ধব/হাট- বাজার / রাস্তা-ঘাট তথা জনবহুল স্থানে যাওয়া যাবে না। কেবল ভদ্রতার খাতিরে আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া বা তাদেরকে আমন্ত্রণ জানানো কোন বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এতে নিজে, প্রানপ্রিয় সন্তান, পিতামাতার সর্বনাশ ঢেকে আনতে পারে । করোনাতো চায়-খাল কেটে কুমির হয়ে তাকে সাদর আমন্ত্রণ জানানো হোক । সে মনের আনন্দে ঘরে ঢুকে বারটা বাজাবে, কুরেকুরে খাবে । কাজেই সাবধানের মার নেই।

ডায়াবেটিস, ফুসফুস, হৃদরোগ, কিডনি, এ্যাজমা, ধূমপান, স্হুলতা ইত্যাদি সমস্যায় যারা আগে থেকে ভোগেন, তাদেরকে করোনা খুব দ্রুত কাবু করে ফেলে। মূলত এরা আক্রান্ত হলে শত চেষ্টার পরও তাদের রক্ষা করা অনেক অনেক কঠিন। কাজেই তাদের জন্য সর্বোচ্চ সাবধানতা এবং সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

শিশুরা সর্বদাই দুর্বল৷ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুব কম। ফলে তাদের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। আর বয়ষ্ক মা-বাবাতো বাসায়/ ঘরে মহান আল্লাহর অশেষ নেয়ামত, বেহেশতের প্রস্রবন। তাঁরা যেন কোনভাবেই আক্রান্ত না হন সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। প্রয়োজনে তাঁদের জন্য একটু বেশি করে নিত্য-প্রয়োজনীয় ঔষধ কিনে রাখা যায়।

মসজিদে গেলে মাস্ক পরা, জায়নামাজ নেয়া এবং নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে নামাজ আদায় করতে হবে।

কাঁচামাল বেচাকেনায় বেশি মানুষের সমাগম হয়। এক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতার মাস্ক পরা অপরিহার্য। আপাতত গ্রামের হাট-বাজারের মধ্যে হতে সরিয়ে নিরাপদ দূরত্বে শাকসবজি, মাছ ইত্যাদি বেচাকেনার ব্যবস্হা করা দরকার।

একান্ত প্রয়োজনে জনবহুল স্থানে যাওয়ার সময় সঙ্গী-সাথী না নেয়া উত্তম।

বাংলাদেশ করোনার টিকা উৎপাদনকারী দেশ নহে। সদাশয় সরকার সকল জনগণকে টিকা দেয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। অনেক দেশের মতো বাংলাদেশে বাস্তবেই রাতারাতি সকলের টিকার ব্যবস্হা করা সম্ভব না। এক তথ্য অনুযায়ী এ পর্যন্ত এক কোটি ১৫ লাখ ৬৫ হাজার ৮৭ জন টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন যা মোট জনসংখ্যার ৬.৮৩% ভাগ এবং টিকা নিয়েছেন মাত্র ৪.২০% ভাগ। সামনের জুন/২১ পর্যন্ত সরকার ৮০% ভাগ লোককে টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৬ কোটি ৯১ লাখ লোকসংখ্যার মধ্যে ১ কোটি ৪০ লাখ ৩৬ হাজার মানুষের বয়স ৬০-এর উর্ধ্বে ( ৮.৩০%)। ৬৫ + বয়সীর মানুষের সংখ্যা ৫.২০%। ৫০ উর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা ২ কোটি ৮৭ লাখ (১৭%)। আর ২০ বছরের উর্ধ্বে ১০ কোটি ৫০ লাখ যা মোট জনসংখ্যার ৬২% -এর মতো।

প্রতিনিয়ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী দেখা যায় যে, ৫০ কিংবা ৬০ উর্ধ্ব মানুষ করোনায় বেশি আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। কোন কোন ক্ষেত্রে নিষ্পাপ শিশুরাও সংক্রমিত হচ্ছে এবং মাঝে মাঝে মারা যাচ্ছে। বিষয়টি বিশ্লেষণ করা দরকার।

সাধারনভাবে সরকারের স্বাস্থ্য বিধি অনুসরণ না করার লোকের সংখ্যা কিন্তু শিশু বা বয়স্ক ব্যক্তিগণ নহে। ২০ থেকে ৪০/৪৫ বছরের মানুষেরা অনেকটা ডেম কেয়ার। কিন্তু এদের প্রায় সবার বাসায় বা ঘরে তাদের পরম শ্রদ্বেয় পিতা-মাতা, দাদা-দাদি, ছোট ছোট শিশু বা ভাই-বোন আছে। তাহলে আমাদের সিনিয়র সিটিজেন বা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিপদ বা ঝুঁকি বাসাবাড়িতে কে টেনে আনছে? বিষয়টি উপলব্ধি করলেই মঙ্গল। টিকা দিয়ে প্রতিকার করার চেয়ে সাবধানতা অবলম্বন করা শ্রেয়।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *