চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা (দ্বিতীয় পর্ব)

যথারীতি ভার্চ্যুয়াল মিটিং শুরু হয়েছে। স্ক্রিনে এগার জনের উপস্হিতি দেখা গেল । সভা ভালোই জমবে বুঝা গেল। একটি বিষয় গভীরভাবে পর্যবেক্ষন করা হলো। যারা সচরাচর বাসার বাহিরে মাস্কবিহীন ঘুরাফেরা করে তারাও ঘরে বসে মাস্ক পরিধান করে সভায় যোগ দিয়েছে । বিষয়টি অতি সাবধানতা নাকি লোক দেখানো বুঝা গেল না। তবে, একটি বিষয় খুবই ইতিবাচক যে মাস্ক পরার অভ্যাস হচ্ছে।

সামাদ সবসময় একটু এডভান্স চলে। তাকে আটকিয়ে রাখা কঠিন। সভা-সমাবেশের শিষ্টাচার, সিনিয়র-জুনিয়র এসবের প্রতি তার আদৌ কোন ভ্রক্ষেপ নাই । যখন যা মনে হয় কেবল বলতেই থাকে। তার কলের গান অটোমেটিক অন হয়ে গেছে। আর বলতে লাগলো – আরে সামনেই ঈদ। তাও আবার কোরবানির ঈদ। এই উৎসবতো প্রতিদিন আসে না। বছরে মাত্র একবার। তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষায় থাকি কখন আসবে ঈদ। গত বছরের ঈদ শয়তান করোনা একবার মাটিই করলো। এবার আর নয়।

আবেদিন সাহেব, বড় ভাই রফিক আর ডাক্তার সিরাজ পরষ্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে। সেদিকে সামাদের খেয়ালই নাই। সে বলতেই থাকলো – আরে! অনেকেই করোনার ভ্যাক্সিন নিয়েছে ৷ আবার দেড়-দুই কোটি টিকা চলে আসছে। এখন আমরা অনেকটা নির্ভার।গত একবছর চুপেচাপে কত ঘুরাঘুরি করলাম। কিছুই হয় নাই। কামাল, জানো তো- আমাদের দেশের মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৭২.৬ বছর। আর আমাদের বয়স মাত্র ২৫/২৬ হবে। সামনে বহু দিন আছে, বহু বছর বাঁচবো। এই বয়সে আড্ডাবাজি, মনের আনন্দে ঘুরাঘুরি না করে কুম্ভকর্নের মতো বাসায় থেকে সময় নষ্ট করা মানায় না। জীবনটা উপভোগ করা, আনন্দ করা, খাওয়া-দাওয়া স্ফুর্তি করা – এটাই এই বয়সের ধর্ম । আমি করোনাকে অত কেয়ার করি না।

এবার আবেদিন বললেন, – আর কতো? থামলে ভালো লাগে। আরে সভায় অনেকই আছেন। চারিদিকে তাকিয়ে কথা বলতে হয়। কথায় যুক্তি, তথ্য এবং বাস্তবতা থাকতে হয়। নচেৎ অনেকে তোমাকে বাঁচাল বলবে। শুনলেনতো। ওর কথায় মনে হচ্ছে, আমরা স্বর্গরাজ্যে বসবাস করছি। তার চারিদিকে, বাংলাদেশে এবং বিশ্বে একটি ভুয়া এবং নির্বীর্য করোনা ভাইরাসের ভয়ে সকলে অহেতুক ভীত-সন্ত্রস্ত। মনে হয় করোনা মানুষের সঙ্গে ইয়ার্কি করছে। আসলেই কি করোনার প্রতি করুনা করবো? বিষয়টি কি এতোই সহজ, তুচ্ছতাচ্ছিল্য পূর্ণ? মোটেই না। তাহলে একটু শোনো। একটা ভয়ংকর এবং লোমহর্ষক ঘটনা বলি।

জী,জী বলেন। সকলের আগ্রহ বেড়ে গেল। সকলের দৃষ্টি আবেদিনের দিকে।

– এক জনবহুল শহর। প্রতিটি মানুষ স্ব স্ব জীবিকার তাগিদে নিঃশঙ্কচিত্তে চলছে। নিত্যদিনের মতো জীবনের চাকা আপন গতিতে ঘুরছে। বরাবরের মতো ঐদিনও শহরের জীবনযাত্রা একবারেই স্বাভাবিক।
এদিকে বিশাল চিড়িয়াখানার কর্মচারিরা কয়েকদিন ধরে অজ্ঞাত কারনে কর্মবিরতি করছে। চিড়িয়াখানার জীব-জন্তুদের কোন খাওয়াই দিচ্ছে না। ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে লোহার শিক এবং নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে হঠাৎ করে কিছু ক্ষুধার্ত বাঘ এবং সিংহ লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। স্বাধীনতা পেয়ে অনেকগুলি আবার আশেপাশের গ্রামাঞ্চলেও ঢুকে পড়েছে। অনেক দিনের ক্ষুধার্ত হিংস্র জন্তুগুলি অন্যান্য পশু না পেয়ে অগত্যা অসহায়, অবলা মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। যাকে যেখানে পেয়েছে , তারা মনের সুখে টেনেহিঁচড়ে চিবিয়ে খেয়ে ক্ষুধা নিবারন করলো। অনেকে আহত হলো। জীবনে কেহ কখনো এমন বিভীষিকাময় পরিস্থিতি কল্পনাও করেনি। মানুষ অসহায়, কিংকর্তব্যবিমূঢ়। জানপ্রাণ নিয়ে যে যেভাবে পেরেছেন কোন মতে জীবন রক্ষা করেছেন। সারা জনপদ ব্যাপি কী মহা আতঙ্ক ! কী অকল্পনীয় এবং লোমহর্ষক ঘটনা ! কখন কার ভবলীলা সাঙ্গ হয় সে ভয়ে সকলে আতঙ্কিত। যারা মারা গেছেন বা আহত হয়েছেন কে তাদের খোঁজ নিবে ? আবার নিজের জীবন যায় । চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা। চারিদিকে বিভীষিকা। গেল গেল! জীবন গেল!

এদিকে অসহায় মানুষ ঘরে বসে যতরকম দোয়া-দুরুদ, ঝাড়-ফুক জানা ছিল তা জপতে লাগলো। কেউ কেউ আবার জিম করবেট বা পচাব্দী গাজীর দুধুর্ষ প্রানী শিকারের গল্প পড়ে ফেসবুক/ বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে মতামত দিলে লাগলো। অন্যদিকে সরকার তাৎক্ষনিকভাবে এই অবাধ্য জন্তুদের খাঁচাবন্দী করতে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে । এদের করায়ত্ত করতে অনেক গলদঘর্ম পোহাতে হয়েছে। অনেক মূল্যও দিতে হয়েছে। দায়িত্বশীল অনেক কর্মকর্তা- কর্মচারীরও জীবনাবসান হয়েছে। অনেকে গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে একবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত লোমহর্ষক দুর্ঘটনায় অনেক অমূল্য জীবন চলে গেছে। তাছাড়া, বিপুল অর্থ, জীবনবাজি যুদ্ধ এবং অমানুষিক শ্রমের কি কোন হিসাব-নিকাশ আছে?

সকলের গা শিহরিত হয়ে উঠলো। শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেল। শ্বাসরুদ্ধকর এবং পিনপতন নীরবতায় সকলে গভীর মনোযোগসহকারে মহা আতঙ্কের দুর্ঘটনাটি শুনলো। এর উপসংহার টেনে তখন আবেদিন বললেন, দেখো – বাঘ-ভল্লুক-সিংহতো দেখা যায়। প্রথম প্রথম মানুষ অসহায় ছিল। ইতোমধ্যে অনেক মূল্যবান প্রান অকারণে চলে গেল। আর উন্মুক্ত জন্তগুলিকে ঘায়েল না করা পর্যন্ত মানুষ বাসা থেকে বের হওয়া ছেড়েই দিল। যার যার মতো করে তৈরি করলো প্রতিরক্ষাব্যুহ। সময়ের সাথে সাথে এগুলোকে মোকাবিলা করা বা এড়িয়ে যাওয়ার কৌশলও রপ্ত করলো। অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে অবশেষে উন্মুক্ত জন্তুগুলিকে ঘাঁয়েল করা বা বন্দী করতে সমর্থ হলো। কিন্তু করোনা ভাইরাস! এই ভয়ংকর মহামারী জীবাণু এত ক্ষুদ্র যে এগুলো খালি চোখে কখনোই দেখা যায় না। অথচ এগুলো আমাদের চারিদিকে অজস্র, অগণিত অবস্থায় সক্রিয়ভাবে বিরাজমান। কেবল মানুষকে হাতছানি দিচ্ছে। আমরা চাক্ষুস দেখি না বলে এই জীবননাশী মহামারী করোনা ভাইরাসের প্রতি আদৌ তোয়াক্কা করি না, সচেতন হই না। সরকার বারবার আদেশ-নির্দেশ দেয়ার পরও এর প্রতি গুরুত্ব দেই না। নিজে বাঁচার চেষ্টা করি না এবং অন্যকে বাঁচতে দেই না, প্রতিকার বা প্রতিরোধমূলক কোন ব্যবস্হা নেই না। অথচ সৃষ্টির সেরা জীব বলে আমরা কতো গর্ব করি। কিন্তু কেউ কেউ আহাম্মকের মতো আচরণ করি। ক্ষুধার্ত জন্তুকে সামনে দেখে ভয়ে হার্ট অ্যাটাক হয়ে মারা যাওয়ার অবস্থা। ভীরমি খেয়ে শেষ হয়ে যায় আর কি। একইভাবে করোনাও ভয়ংকর, জীবননাশী। চোখে দেখি না। এজন্য অত কেয়ার করি না। একটু তুলনা করো। আমরা সজাগ এবং সচেতন না হয়ে ক্ষুধার্ত, হিংস্র বাঘ-সিংহ রুপি মহামারি করোনাভাইরাসকে মহানন্দে প্রতিনিয়ত আলিঙ্গন করছি । ফলাফল -সবই জানা।

উপস্থিত সকলে একবাক্যে স্বীকার করলো- আমরা অনেকেই সচেতন বা অসচেতন হয়ে ইতোমধ্যে অহেতুক অনেক সময় নষ্ট করেছি। এতে অনেক মূল্যবান জীবন অকালেই ঝরে পড়েছে। অনেক পরিবার একবারেই অসহায় এবং পঙ্গু হয়ে গেছে। আবার কেউ এই যাত্রায় বেঁচে গেলেও অনেক অর্থদন্ড দিতে হয়েছে। সামনে যে কার কখন অকাল মৃত্যুঘন্টা বেজে ওঠবে তা বলা অনিশ্চিত। আর নয় হেলায় জীবন-অর্থ-সময় নষ্ট করা। আমরাই সম্মিলিত এবং সমন্বিতভাবে আমাদের এলাকায় করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ এবং প্রতিকারে উদ্যোগ নিব। সরকারের সকল আদেশ-নির্দেশ মেনে চলবো। সরকারের প্রত্যেক দপ্তরকে সকল ধরনের সহযোগিতা দিব। তাছাড়া, জনগণকে সচেতন করার লক্ষ্যে ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্হা করবো।

জহির, তুমিতো ভালো লিখতে পারো। আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে তুমি লিখে ফেলো । তাহলে সময় বাঁচবে।

জী,ভাই – জহির জবাব দিল।

বিদগ্ধ জনের ভার্চুয়াল মিটিং-এর কার্যবিবরনী সংশ্লিষ্ট সকলের অবগতি এবং বাস্তবে প্রয়োগের অনুরোধসহ প্রেরণ করা হলো।

(চলবে)

চাচা,আপন প্রান বাঁচা

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *