চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা

(প্রথম পর্ব)

“দোস্ত, কতোদিন দেখিনি তোরে। ঘরে বসে বসে কি করিস? আন্ডা পাড়িস? এজন্যই তোরে সকলে ঘরকুনো ব্যাঙ বলে। আরে, জীবন কয়দিনের? আমরা সাত-আটজন প্রতিদিনই আড্ডা দেই শাহ আলমের ‘মজাদার কফি’ শপে । আরে দূর! করোনা-মরোনা এসব হাবিজাবি মালকে পাত্তা দিলেই সমস্যা। এই বয়সে লোহা খাইয়া লোহা হজম কইরা ফেলি। ভিতুর হাড্ডি কোথাকার? আজ না আইলে কিন্তু তোর খবর আছে। নাম কাটা যাবে।” এক নিঃশ্বাসে রোমেল তার হৃদয়ের বন্ধু কামালের উদ্দেশ্যে এতগুলো বয়ান দিল।

“আরে, রোমেল। তুই হাসাইলি। তুই কি জানিস- সুখে থাকতে ভুতে কিলায়। আহারে! মহামারী করোনা কত মানুষের প্রানবায়ু কাইড়া নিছে। কি বুড়া, কি জোয়ান, কি নিষ্পাপ শিশু! করোনা কাউকে খাতিল করে না, কোন দয়ামায়া নাই । এঠা একটা পাষন্ড দানব। আঁধা- দেঁধা। শুনলাম সেদিন পাশের বাসার করিম চাচার একটু-আধটু কাঁশি হয়েছে। করোনা আসার পর তিনি কিন্তু বাসার থেকে খুব একটা বের হতেন না। তবে, ওনার ছোট ছেলে বাচ্চু কি কারো কথা শুনে? পুরাপুরি বেয়াড়া। অকারনেই বাসার থেকে বের হয়, আড্ডা দেয়। স্বাস্হ্যবিধি মানার ধারেকাছেও নাই। ”

সে আরো বললো । হঠাৎ চাচা গুরুতর অসুস্থ হলো, হাসপাতালেও নিল। ডাক্তার বলল- উনার অবস্থা খুবই খারাপ। এর দুই দিন পরেই তিনি শেষ। ইচ্ছা থাকলেও ভয়ে চাচার জানাযাতে এবং কবর দিতে যেতে পারি নাই । জানাযায় খুব কম লোক হয়েছে। পরে শুনলাম, তার বৃদ্ধা মা করোনা পজিটিভ। তবে, দয়াময় আল্লাহ রক্ষা করেছেন।

-কামাল এখানে ক্ষান্ত হয়নি। সে আরও যোগ করলো। করোনা সারাদেশে কতো ডাক্তার, পুলিশ, প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, জনপ্রতিনিধি, ধনী-গরীবকে নিয়া গেছে। ভাই, মাফ চাই, আমার বাবা-মা আছেন, ভাই-বোন আছে। পাড়া-পড়শী আছেন। আমার জীবন যেমন মূল্যবান, তেমনি আমার কাছের মানুষের জীবনও। কামাল স্বাস্থ্য সচেতন। দেশ-বিদেশের করোনা সম্পর্কে হালহকিকত জানে।

-আরে, করোনা কি তুই দেখেছিস? গরম চা-কফি খাবো। ঐ শপের সিঙ্গারা, পুরি কী যে মজা! গরম জিনিসকে করোনা ভয় পায়। তাছাড়া, বাসায় এসে সাওয়ারে গোসল করলে সব ফকফকা, করোনার গোষ্ঠী ধুঁয়ে মুছে সব পরিষ্কার। এরা কিছুই করতে পারবে না। অকাট্য যুক্তি আর জ্বলন্ত উদাহরণ দিল রোমেল।

পাল্টা যুক্তি দাঁড় করল কামাল। বলল,-দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা দিতে জানিস না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বারবার স্বাস্হ্যবিধি মানার জন্য আহবান জানাচ্ছেন, কতোভাবে সচেতন করছেন। দেশ- বিদেশের অভিজ্ঞ ডাক্তার উপদেশ দিচ্ছেন। এসব তো তাঁদের নিজের জন্য না। এসব উপদেশ একবারেই আমার-তোর-আমাদের সকলের জন্যে। মনে রাখিস – এগুলো একান্ত অপরিচিত, বাঁচা-মরার ধর্ম।

রোমেলতো নাছোড়বান্দা। পড়ালেখায় অত ভালো না। তবে, তর্কে তার জুড়ি ভার । রোমেল জবাব দিল- আচ্ছা, হইছে। আর উপদেশ দিতে হবে না। তুই অনেক বড় পন্ডিত হয়ে গেছিস। বাঙালি মাইক পাইলে আর ছাড়ে না। দর্শক-শ্রোতা আছে কিনা খেয়াল থাকে না। কতোজন প্রতিদিন মনের সুখে ঘুরে। হায়াত মউৎ আল্লার হাতে। আজরাইল আসলে কেহ ঠেকাইতে পারবে না। তুই কাপুরুষ, ভীতু। করোনাকে আমি অত কেয়ার করি না। যে কয়দিন বাঁচি আমোদ ফুর্তি কইরাই বাঁচতে চাই। করোনাকে ডেম কেয়ার করি।

কামালও কম যায় না। আরও যোগ দিল।
-সেদিন ম্যাজিস্ট্রেট মোবাইল কোর্ট করতে নামছে শুইন্যা ইঁদুরের মতো দৌঁড়াইয়া পালাইলি কেন? খালি খালি রাস্তা-ঘাটে ঘুরাঘুরি করিস, কোন মাস্ক পরিস না। মানুষেরও কোন কাম নাই। বেহুদা ঘুরাঘুরি করে। সন্তোষজনক কোন জবাব দিতে পারে না । এজন্য কতো টাকার জরিমানা খাইলো। আহ! গরীব মানুষ! একশো টাকা কামাই করতে কতো কষ্ট! বারবার সচেতন করা, মাইকিং করা, নিষেধ করার পরও মজা করতে গিয়া সাজা খাইট্টা আইলো। সমাজে মুখ দেখাবে কেমনে? আর তোরা তো চোর – পুলিশ খেলা খেলিস। আবার “টম এন্ড জেরি”- র মতো লুকোচুরি খেলছিস। সমাজ- সচেতন মানুষ হিসেবে আমি তোদের মতো আজাইরা কাজে নাই। আমি বাবা,
” চাচা আপন প্রান বাঁচা” – এই নীতিতে বিশ্বাসী। বিনোদনের নামে পুলিশের মাইর খাইয়া ভুত হতে রাজি না।

– দোস্ত, চুপচাপ, কম কথা বলা, আড্ডাবাজি না করা,মানুষ- সমাজ নিয়ে চিন্তা করা তোর অনেক দিনের অভ্যাস। তবে, তোর কথায় যুক্তি আছে, কঠিন বাস্তবতা আছে। ভালো কিছু কথা বলেছিস। আমি এবং আমরা এগুলো মানবো। আসলেই আমরা এবং দেশের অজস্র মানুষ অকারণেই ঘরের বাহিরে যাচ্ছে, জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। এখন থেকে আমরা সরকারের স্বাস্থ্য বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করবো, নিজে মানবো, অন্যকে মানতে সহায়তা করবো, মানুষকে সচেতন করবো। রোমেল কামালের ক্ষুরধার যুক্তির কাছে হার মানলো।

কামালের কথা তার মনে ধরেছে। এবার সে আরও যোগ দিল- দোস্ত, এখন ডিজিটাল বাংলাদেশ। চল, আমরা কাল সকালে করোনামুক্ত পরিবেশ সৃষ্টিতে, সমাজকে, মানুষকে, প্রশাসনকে সহায়তা করতে ভার্চ্যুয়াল জুম মিটিং করবো। আমাদের সুচিন্তিত মতামত জনগণের নিকট তুলে ধরবো।

কামাল অনেক দিন থেকে এই বিষয়টি নিয়ে ভাবছে। সে আরও বলল- আমাদের সকল বন্ধু, বড় ভাই রফিক, ডাক্তার সিরাজ, সমাজ সংস্কারক আবেদিন ভাইও সংযুক্ত হবেন। বেশ ভালোই আলোচনা হবে।

-আচ্ছা, তাহলে আজকের মতো রাখি।
– রাখ, ধন্যবাদ।
(চলবে)।

 

লেখক : মোঃ মাকছুদুর রহমান পাটওয়ারী, সাবেক সিনিয়র সচিব, ভূমি মন্ত্রণালয়

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *