ডা. পলিনের তত্ত্বাবধানে করোনা জয় করলেন চাঁদপুর সদরের প্রথম আক্রান্ত যুবক

  • সুস্থ হওয়ার পর সদর উপজেলায় প্রথম করোনাজয়ী নান্নুর রহমান। পাশে ডা. সাজেদা পলিন।

ইব্রাহীম রনি :
করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সাজেদা পলিনের তত্ত্ববধানে হোম আইসোলেশনে থেকে চিকিৎসা নেয়ার পর সুস্থ হয়েছেন চাঁদপুর সদর উপজেলার প্রথম আক্রান্ত ব্যক্তি মো. নান্নুর রহমান খান। তিনি নারায়ণগঞ্জের মর্ডান ডায়াগণস্টিক সেন্টারে সিটিস্ক্যান এন্ড এমআর আই ডিপার্টমেন্টে মেডিকেল টেকনোলিজিস্ট পোস্টে কর্মরত। গত পহেলা এপ্রিল তিনি চাঁদপুর আসার পর শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে হটলাইনে যোগাযোগ করার পর ৮ এপ্রিল তার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তীতে ১২ এপ্রিল তার রিপোর্ট পজেটিভ আসে। এরপর তিনি চাঁদপুর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সাজেদা পলিনের পরামর্শমতে ১৪ দিন আইসোলেশনে কিছু চিকিৎসা নেয়ার পর তিনি সুস্থ হয়েছেন। এরপর বলেছেন করোনা জয় করতে ডাক্তার এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্তরিকভাবে তত্বাবধানসহ সেবদানের কথা।

  • করোনাজয় করে সুস্থ হওয়ার পর ফেইসবুক লাইভে এসে অভিজ্ঞতার কথা বিস্তারিত বলেন নান্নু।

করোনা আক্রান্ত এবং সুস্থ হয়ে উঠার বিষয়ে তার অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন ভিডিও বার্তায়। নান্নুর রহমান খান বলেন, আমি গত পহেলা এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ থেকে চাঁদপুর আসি। এর দু’দিন আমার শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। আগেও আমার এরকম শ্বাসকষ্ট হতো। আর আমার মাও ছিলেন সিওপিডি রোগী। মাঝে মাঝে আমার শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে ওষুধ খেলে ভালো হয়ে যেত। কিন্তু এবার শ্বাসকষ্ট সহজে কন্ট্রোল হচ্ছিল না। আপনারা জানেন, সারাবিশ্বে করোনাভাইরাসে যে মহামারি চলছে তার অনেকগুলো সিম্পটম। তার মধ্যে শ্বাসকষ্ট, গলাব্যাথা, জ্বর ইত্যাদি।

তিনি বলেন, আমার শ্বাসকষ্ট কমছে না দেখে আইইডিসিআর-এ যোগাযোগ করি। সেখান থেকে আমাকে চাঁদপুরের করোনা কন্ট্রোল রুমের একটি হটলাইন নম্বর দেয়। এখানে যোগাযোগ করার পর গত ৮ এপ্রিল আমার স্যাম্পল সংগ্রহ করে। ১২ এপ্রিল আমাকে জানানো হয় আমি করোনায় আক্রান্ত।
এরপর ডা. সাজেদা পলিন ম্যাডাম আমাকে প্রেসক্রাইব করেন এবং কিছু নিয়মকানুন মানার জন্য পরামর্শ দেন। আলাদা একটা রুমে যেন আামি আইসোলেশনে ১৪ দিন থাকি সে পরামর্শও দেন। সে পরামর্শ অনুযায়ী আমি ওষুধ খেয়েছি। গরম পানি খেয়েছি, গরম পানির ভাস্প দিয়েছি, লেবুর শরবত খেয়েছি এবং অন্যান্য স্বাভাবিক খাবার যেগুলো খাওয়ার উপযোগী মনে হতো তার সবই আমি খেতাম।
তিনি বলেন, চিকিৎসা চলাকালীন ২০ এপ্রিল আমার আরেকটি নমুনা সংগ্রহ করে করার পর সেটির রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। এরপর আবার ২৬ এপ্রিল আরেকটি নমুনা সংগ্রহ করার পর সেটিও নেগেটিভ আসে। দু’বার নেগেটিভ রিপোর্ট পাওয়ার পরও আমাকে আরও কিছুদিন আইসোলেশনে থাকতে হয়েছে। এই পজেটিভ রিপোর্ট থেকে নেগেটিভ রিপোর্ট আসা এ পর্যন্ত আমি খুব ভালো আছি। আমার কোন সমস্যা আপাতত নেই।

তিনি বলেন, কোভিড ১৯ সারাবিশ্বে মহামারি আকার ধারণ করেছে। আমাদের বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম নয়। আমরা যদি সবাই সচেতন হই, নিয়ম মেনে চলি, তবে ইনশাল্লাহ এই করোনা থেকে দূরে থাকতে পারবো। করোনা আমাদের কিছুই করতে পারবেনা। আমরা যারা সেবামূলক কাজে আছি- যেমন ডাক্তার, টেকনোলোজিস্ট, মেডিকেল অ্যাসিসটেন্ট, সিস্টার এবং আমাদের প্রশাসনের বাহিনী যারা মাঠে কাজ করছে আমরা সবাই কিন্তু অনেক ঝুঁকিতে আছি। আমরা যদি অসুস্থ হই সেগুলো কিন্তু কোন না কোন রোগীর মাধ্যমেই আমরা অসুস্থ হয়েছি। একজন করোনা রোগী আমাদের সংস্পর্শে আসলেই কিন্তু আমাদের আক্রান্ত হওয়ার আশংকা বেড়ে যায়। সেভাবেই কিন্তু আমরা আক্রান্ত হয়েছি বলে মনে করছি।
তিনি বলেন, আপনারা কখনো রোগ হলে ভয়ে-লজ্জায় না লুকিয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন। এই টেস্ট করতে কোন টাকা লাগে না। আপনি যেখানে আছেন সেখান থেকেই এসেই স্যাম্পল সংগ্রহ করে নিয়ে যাবে। আমাদের মেডিকেল যে টিম আছে সেই টিমের ডাক্তাররা অনেক আন্তরিক। আপনাদের যদি একবার সমস্যা হয়েই যায় তাহলে ফোন করে দেখুন তারা কত আন্তরিক। আপনি তাদের কাছ থেকে সার্বিক সহযোগিতা পাবেন।
তিনি আরও বলেন, আপনারা সব সময় দূরত্ব বজায় রাখবেন। স্যানিটাইজার দিয়ে দুই ঘন্টা পর পর হাত ধোয়ার চেষ্টা করবেন। মাস্ক ব্যবহার করবেন। সম্ভব হলে গজ ব্যবহার করবেন। সাধ্যের মথ্যে থাকলে পিপিই কিনে নেবেন। বাজার থেকে পণ্য নিয়ে আসলে সেটি দু-তিন ঘন্টা এক জায়গায় রেখে দিন তারপর সেটি আপনি ব্যবহার করেন। আর যদি তাৎক্ষণিক রান্না করতেই হয় তাহলে অন্তত আধঘন্টা ভিনেগার অথবা শুধু পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখুন। তাহলে করোনা ভাইরাসটা মরে যাবে। আমরা যদি একটু সতর্ক থাকি তাহলে করোনামুক্ত থাকতে পারবো।

  • করোনাকালে সচেতনতামূলক বক্তব্য রাখেন ডা. সাজেদা পলিন

এ বিষয়ে সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সাজেদা পলিন বলেন, তিনি সচেতন থাকায় আমাদের ফোন করে তার সমস্যার কথা জানান। পরে তার রিপোর্ট পজেটিভ আসার পর তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। প্রথমে একটু ঝামেলা করছিলেন। পরে ইউএনও ম্যাডাম, পুলিশ, স্থানীয় চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় তাকে বাসায় থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করি। এর মধ্যে সিভিল সার্জন স্যারও আমাকে করণীয় সব কিছু করার নির্দেশনা দেন। তারপর করোনা চিকিৎসা যা যা দেয়া দরকার সব কিছু দেই। অনলাইনের মাধ্যমে প্রেসক্রিপশন পাঠাই। এরপর তার পাঠানো এক লোক এবং আমাদের এক স্বাস্থ্যকর্মী একটি ফার্মেসি থেকে ওষুধ দেয়া হয়।

তিনি বলেন, মাঝখান দিয়ে তিনি একটু অসুস্থ হয়েছিলেন। তার বুক জ্বালা-পোড়া করছিল। পরে আমাকে জানালে তাকে প্রেসক্রাইব করি। যখনই কোন সমস্যা মনে করতো তখনই আমি তাকে পরামর্শ দিতাম। পরবর্তীতে দু’বার তার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার পর তার রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। এরপর সে বাসা থেকে বের হতে চাইলেও তাকে আরও ৭ দিন বাসায় থাকার নির্দেশনা দেই। এখন তিনি সুস্থ্য। এরপর তিনি নিজ উদ্যোগে তার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে একটি ভিডিও বার্তা দেন।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.