বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরা বাঙালী জাতীর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে

অধ্যাপক ড. মো. লোকমান হোসেন :
“ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলব, আমি বাঙালী, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা। জয় বাংলা”। এই উক্তিটি ছিল সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, স্থপতি, রূপকার ও বাস্তবায়ক, বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা, বাঙালির রাখাল রাজা, জুলিওকুরি পদক বিজয়ী মহান নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। যিনি গোপালগঞ্জ জেলার মধুমতি নদীর তীরবর্তী নিভৃত পল্লীর ছায়াঢাকা গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায় ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ, মঙ্গলবার রাত ৮ টায় জন্মগ্রহণ করেন। শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন টুঙ্গিপাড়ার বিখ্যাত শেখ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা শেখ জহির উদ্দীনের সপ্তম উত্তর-পুরুষ শেখ লুৎফর রহমান এর তৃতীয় সন্তান । তিনি ছিলেন সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। সাত কোটি বাঙালীর বিংবদন্তীতুল্য নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের শৈশব-কৈশোর এবং যৌবনের লালন গ্রামীণ পরিমন্ডলের ঐ গোপালগঞ্জে। কথাটাকে এখন এইভাবে বলতে চাই, কৃষি আর নদী বিধৌত বাংলায় ভিত্ তৈরি হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের। এইখানেই তাঁর অনন্যতা।
বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা জীবনের সূচনা ঘটে স্বগৃহে পন্ডিত সাখাওয়াৎ উল্লাহর কাছে। আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় ১৯২৭ সালে গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৪২ সালে গোপালগঞ্জ মিশনারী হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে কলিকাতার ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হয়ে জড়িয়ে পড়লেন প্রত্যক্ষ রাজনীতির সাথে। তাঁর জন্যে সেইটেই যেন স্বাভাবিক বা অনিবার্য ছিল। কলকাতার রাজপথে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন। সারা দেশ জুড়ে তখন গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল তরঙ্গ ‘ইংরাজ হটাও’ আন্দোলন। ১৯৪৫-’৪৬ কলকাতায়, বাংলায় তথা সমগ্র ভারতবর্ষ জুড়ে তখন ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রচন্ড গণঅভ্যুত্থান! –বোম্বাই করাচীতে নৌ-সেনাদের বিদ্রোহ, শত সহস্র কণ্ঠে গর্জন ‘চলো চলো দিল্লী চলো‘, সারা ভারত ধর্মঘট এবং গ্রামাঞ্চলে কোথাও কোথাও তেভাগা আন্দোলনের বিস্তার। কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে ‘লীগ-কংগ্রেস এক হও’ স্লোগানে মিছিল জমায়েত, মুসলিম লীগের অর্ধচন্দ্রখচিত সবুজ পতাকা, কংগ্রেসের তেরঙ্গা পতাকা আর দুয়ের মাঝে কমিউনিস্টদের কাস্তে-হাতুড়ি চিহ্নিত লাল পতাকা– তিনটে একই গুচ্ছে বাঁধা। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর ক্রান্তিকালে পরাশক্তির অধীন ভারতবর্ষের ইতিহাসে তখন দ্রুত পালাবদলের প্রক্রিয়া। কে জানত তখন মুসলিম লীগের পাকিস্তানিত্বের কোটর থেকে কোন অলক্ষ্যে জন্ম নিচ্ছে একজন এবং তিনি হয়ে উঠবেন বাঙ্গালিত্ব স্থাপনার মহানায়ক।
বঙ্গবন্ধু কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে ১৯৪৪ সালে আই.এ এবং ১৯৪৭ সালে বি.এ পাশ করে ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ এই সময়কালে প্রায়শই কারাভ্যন্তরে কখনো প্রতিবাদ অনশনে, কখনো রাজপথে দু:শাসনের সরকার বিরোধী মিছিলের নেতৃতে, পুলিশের লাঠিচার্জ — এই সবই যেন তাঁর অঙ্গসত্যে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। প্রচন্ড সাংগঠনিক ক্ষমতা, অমিত সাহস, অসীম ভালোবাসা, এসব মিলেয়ে যে মানুষটি তৈরী হয়েছিলেন, তিনি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। প্রতিদানে দেশবাসীও তাঁকে ভালোবেসে ‘বঙ্গবন্ধু’ অভিধায় হৃদয়ে আপন করে নিয়েছিল।
যখন ইতিহাস কোনো ব্যক্তিকে নির্মাণ করে, তাঁরাই সত্যিকারের ইতিহাসের সন্তান। মহাকালের পটে এমন উজ্জ্বল মানুষের কথা আমাদের জানা রয়েছে। বর্তমান প্রসঙ্গে আমরা তেমনি একজন শেখ মুজিবকে অবলোকন করবার প্রয়াস পেয়েছি, যিনি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের স্থপতি। বর্তমান শতকের এশিয়া ভূখন্ড থেকেই উদাহরণ টেনে বলা হয়- আধুনিক তুরস্কের জনক কামাল আর্তাতুক, ভারতের বাপুজী মহাত্মা গান্ধী, ভিয়েৎনামের আঙ্কল হো’, ইন্দোনেশিয়ার ড. সুকর্ণ, মালয়েশিয়ার টিংকু আব্দুর রহমান, নামিবিয়ার স্যাম নুজুমা এবং তান্জানিয়ার জুলিয়াস নায়ারের ন্যায় এই তালিকায় সংযোজন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিশ্ব ইতিহাসে এই প্রকারের ত্রাতা পুরুষ যাঁরা, আপন নাম- পরিচিতির ঊর্ধ্বে এবং দেশের-সীমানা ছাড়িয়ে তাঁদের অবস্থান। আমাদের সুভাগ্য যে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের ক্ষুদ্রায়তন একটি দেশে আমরা তাঁকে পেয়েছিলাম।
বঙ্গবন্ধু তাঁর ৫৫ বছরের জীবনকালের অধিকাংশ সময়ই বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে অতিবাহিত করেছেন। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য গ্রেফতার হয়েছেন, কারাগারে দিনের পর দিন অনশন করেছেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করলে পাকিস্থানি জালেমরা বাঙালিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে মাত্র ৫ দিনের ব্যবধানে আবার ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়, তখন বঙ্গবন্ধু ষ্পষ্ট বুঝেছিলেন গণআন্দোলন ছাড়া বাংলার মানুষের অধিকার আদায় সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে বাংলার বুকে বঙ্গবন্ধু গড়ে তোলেন পাকিস্থানি শাসক বিরোধী গণআন্দোলন। কিন্তু কুখ্যাত আইয়ুব খান সামরিক শক্তির ছত্রছায়ায় ক্ষমতায় আসীন হয়েই বাঙালিদের উপর ব্যাপকভাবে নির্যাতন শুরু করেন এবং বঙ্গবন্ধুকে বার বার কারাগারে নিক্ষেপ করেন। বাধ্য হয়ে বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালের ১৮ মার্চ বাঙালির মুক্তির সনদ ‘ছয় দফা কর্মসূচী’ ঘোষণা করেন । ছয় দফার প্রচারনায় বঙ্গবন্ধু বলেন “আমরা চাই তথাকথিত প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের রাজনীতির অবসান ঘটুক এবং রাজনীতি মানুষের অধিকারে আসুক। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা ঘোষণা এবং ১৯৭১-এর ৭ মার্চে রমনা রেসকোর্স ময়দানের জনসমুদ্রে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ। সময় মাত্র পাঁচ বছর, এই স্বল্পসময় ব্যবধানেই মানুষটি নেতৃত্বের আর ভালোবাসার কর্মী, সংগঠক, নেতা জনমত নির্বিশেষে সারা দেশের সাত কোটি মানুষের হৃদয়ের আসনে অভিষিক্ত হয়ে গেছেন।
ঐ পাঁচ বছরে বাংলাদেশের জন্যে বিস্ময়কর দ্রুততায় ইতিহাসের রথচক্রের আবর্তন ঘটে। কোটি মানুষের নি:শঙ্ক নিশ্চিত নির্ভর কোথায় সেই জননেতা এমন ভাষায় নির্দেশ উচ্চারণ করতে পারেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলো। বজ্রকণ্ঠে তাঁর অজেয় আহ্বান, ”আমার পয়সায় কিনা অস্্র ব্যবহার হচ্ছে আজ আমার মানুষের বুকের উপর” তোমাদের উপর আমার নির্দেশ রইল-যা কিছু আছে তা নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা কর। রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ ! ‘সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। … এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ দেশবাসী একান্ত চিত্তে তা ই চাইছিল। ব্যাপারটা এক দিনের নয়, দীর্ঘকালের। দীর্ঘকালব্যাপী মানুষের বঞ্চনা, ক্ষোভ, প্রতিবাদ এ সমস্ত কিছু সংগঠিত করে একটি বিশেষ স্রোতমুখে বইয়ে দেবার ব্যাপক বিশাল কর্মকান্ড রয়েছে। সারা দেশের সর্বত্র অজস্ত্র কর্মীকে নিয়ে প্রতিরোধের দেয়াল নির্মাণ করতে হয়েছে। যাদের চোখে দেখবার অভিজ্ঞতা রয়েছে, বিভিন্ন সময়ে অন্দোলনে যারা সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন তাঁরা জানেন বাংলাদেশের ইতিহাস কাজ করে গেছে শেখ মুজিব নামের মানুষটির ভেতর দিয়ে। জীবনের শ্রেষ্ঠ বছরগুলোতে তিনি দু:শাসন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধুর ছিল হিমালয়সম দৃঢ়তা আর বাঙালি জাতির প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা। তাই তো ১৯৭০ সালের নির্বাচনী প্রচারনাকালে বাগেরহাটের এক জনসভায় বলেছিলেন – ‘শুধু প্রধানমন্ত্রী কেন, সারা দুনিয়ার ঐশ্বর্য আর ক্ষমতা আমার পায়ের কাছে ঢেলে দিলেও আমি দেশের, বিশেষ করে বাংলার বঞ্চিত মানুষের সাথে বেঈমানী করতে পারবো না‘। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩১০ আসনের মধ্যে ৩০৫টি আসন লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্টতা অর্জন করে। কিন্তু ইয়াহিয়া খান বাঙালিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে বঙ্গবন্ধু ৩ মার্চ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। ৭ মাচের্র ঐতিহাসিক জনসভায় রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত জনসমুদ্রের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পরোক্ষ ঘোষণা দেন এবং বাঙালী জাতিকে বিশ্বের কাছে বীরের জাতি হিসেবে তুলে ধরেন। একদা সহকর্মীদের মুজিব ভাই, ময়দানে লক্ষ মানুষের জমায়েতে আভিষিক্ত হয়ে গেলেন ‘বঙ্গবন্ধু’ অভিধায়। ‘জয় বাংলা’, ‘বঙ্গবন্ধ’ু আর ’মুক্তিযুদ্ধ’ এই তিনে মিলে যে কী উত্তল তরঙ্গ ’লক্ষ পরাণে শঙ্কা না মানে’। একাত্তরের দিনগুলি সেই স্বাক্ষরে উজ্জ্বল। একই সড়কে যাঁরা সহযাত্রী তাঁদের ত’অভিজ্ঞতায় রয়েছে ‘মুজিব’ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’তে উত্তরণের ইতিবৃত্ত।
অবশেষে এসে যায় বাংলাদেশ তথা পৃথিবীর ইতিহাসের সেই নিকষ, নিরঙ্কুশ কাল রাত ২৫শে মার্চ ১৯৭১। শুরু হয় গণহত্যা। রাত সাড়ে বারোটায় বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন ঐতিহাসিক ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র‘। তারপর পরই হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে বন্দী করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধে বাঙালির শ্লোগান ছিল – “তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব, শেখ মুজিব”। “ভুট্টোর মুখে লাথি মার বাংলাদেশ স্বাধীন কর”। এই অনুপ্রেরণায় ৭ কোটি বাঙালি ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ছিনিয়ে আনে মহান বিজয়। স্বাধীনতা ও ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের বর্ণনা দিতে গিয়ে কবি নির্মলেন্দু গুণ তাঁর অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন নিম্মরুপভাবে —
”শত বছরের সংগ্রাম শেষে,
রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাড়ালেন।
তখন পলকে দারুন ঝলকে তরীতে উঠিল জল,
হৃদয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার
সকল দুয়ার খোলা। কে রোধে তাঁহার বজ্রকন্ঠ বাণী ?
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে, কবি শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি:
’এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।
সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের ।

১৯৭১-এ সর্বত্র আলোচিত দুটি দেশ-ভিয়েৎনাম আর বাংলাদেশ। এক দেশে মার্কিন বিমান বাহিনীর কার্পেট বম্বিং আরেক দেশে পাকিস্তানী সৈন্যের জেনোসাইড। উভয় দেশেই সাধারণ গণমানুষের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। এইখানে একটি নজির রয়েছে যে, দেশের সর্বাত্মক প্রতিরোধ সংগ্রাম উজ্জীবিত হয়েছে এবং বিজয়ী হয়েছে অনুপস্থিত নেতার প্রেরণা। কী সেই প্রেরণা যা ঐ সময়ে কোটি কোটি মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল? সেই ছিল একটি শপথ ‘ফাসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলব, আমি বাঙালী, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা। “জয় বাংলা”। আমরা স্মরণ করব মরণজয়ী ঐ মন্ত্র যা কেমন করে আমাদেরকে অকুতোভয় ও দুঃসাহসী করে তুলেছিল। শেখ মুজিব নামের মানুষটি তখন আর রক্তমাংসের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের দেহধারী মাত্র নন, আমাদের সমুদয় আকাক্সক্ষা আর স্বপ্ন নিয়ে তিনি একটি অনড়, অটুট বিশ্বাসে পরিণত। সবারি ত’ জানা, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঐ সময়টাকে বঙ্গবন্ধু দেড় হাজার মাইল পশ্চিমে পাকিস্তানের জিন্দানখানায় মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত বন্দী। মাতৃভূমির স্বাধীনতা সংগ্রামের সেনাপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ দেশদ্রোহিতার।
বাংলা জাতিসংঘের ভাষা হবে সেই লক্ষ্যে বাংলা ভাষায় জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেসনে বক্তৃতার মাধ্যমে বাঙ্গালীর আশা আখাংকার কথা জানিয়েছিলেন বিশ্বদরবারে। কিন্ত ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর বেলায় বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটে যায় এক নৃশংসতম হত্যাকান্ড। বাঙ্গালী জাতির বরপুত্র বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন স্বাধীনতার শত্রুদের হাতে। শত বৎসরের বাঙ্গালীদের লালিত সপ্নকে পদদলিত করার জন্য, ৭৫ পরবর্তী ঘটনাবলী তাই প্রমাণ করে। হত্যাকারীরা বাঙালী জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সেইদিন থেকে বঙ্গবন্ধুর শাসন আমলের সকল অর্জন ম্লান করে দিয়ে দেশকে ভিন্ন পথে পরিচালিত করে। শুরু করে মিথ্যা প্রচারণা ও ষড়যন্ত্র। আগস্ট মাসটি শোকের মাস এবং ১৫ আগস্ট পিতৃহত্যা দিবস। এ মাসের প্রতিটি দিনই অনেক কষ্টের, কারণ এই মাসে আমরা হারিয়েছি জাতির পিতা, সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। যিনি ৪০ এর দশক থেকে ৭০ এর দশক এর মাঝামাঝি সময়কাল পর্যন্ত বাংলার মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির জন্য বহু ত্যাগ স্বীকার করেছেন। যৌবনের বেশীরভাগ সময় বাংলার মানুষের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার জন্য জেল খেটেছেন। আমার মতে তিনি বেচেঁ থাকলে বাংলাদেশ অনেক পূর্বেই জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মত হতো –কারণ গ্রহনযোগ্যতা ও দুরদর্শিতা আমাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যেত অনেক অনেক দুর।
যেদিন জগতে চলে আসি
কে দিল আমাকে বাঁজাতে বাঁশি
বাজাতে বাজাতে তাই মগ্ধ হয়ে আপন মনে চলিয়া গিয়াছি একান্ত সুদুরে
ছাড়িয়ে সংসার সীমা।

এই প্রজন্মের অবশ্য-প্রাসঙ্গিক কৌতুহল। বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা হলেন কি করে ? তিনি ছিলেন রাজনৈতিক দলের একনিষ্ঠ আপোষহীন কর্মী, একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন-তৈরি ও কর্মকান্ডের দক্ষতায়, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যাভিসারী দুৎসাহসিক পরিচালনা-কৃতিত্বে পটিয়শি। তারপর কখন সেই মানুষটি নিজেকে ছাড়িয়ে, দলীয় সংগঠনকে ছাড়িয়ে সমগ্র জাতির কোটি মানুষের পিতা হয়ে গেলেন। সবাই তাঁকে আত্মার সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতম করে হৃদয়ে ধারণ করে নিল। লক্ষ লক্ষ মানুষ অন্তরের গভীরে শ্রবণ করেছিল মরণজয়ী সেই ডাক–‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম …’। হঠাৎ করেই ডাক এবং হঠাৎ করেই মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া– কদাপি এমন হয় না। তাহলে অবশ্যই পেছনে রয়েছে অনেক কিছু। পেছনে রয়েছে বাংলার আপামর মানুষের দীর্ঘ বঞ্চনা-শোষণ-দাসত্বের চরম দুঃখভরা জীবন। জোরটা সেইখানে যেখানে আমাদের সবার জন্যে গর্বের উৎস–আমাদের ত’ হাজার বছরের আবহমান বাংলা, আমরাই করেছি ভাষা আন্দোলন, বিজয়ী হয়েছি মুক্তিযুদ্ধে এবং আমাদের বঙ্গবন্ধু জন্মেছিলেন এই বঙ্গে। বাঙালী জেগেছে আপন সত্তায়, বাঙালী লড়েছে, জয় করে নিয়েছে সকল প্রতিকুলতাকে।
যতকাল রবে পদ্মা, মেঘনা
গৌরী, যমুনা বহমান
ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।

‘বাংলাদেশ’ নামক মূল্যবোধ থেকে সন্তানেরা ক্রমে সরে যাচ্ছে এক বৈরী ভুবনে। ১৯৪৮-১৯৫২তে ভাষা আন্দোলন এবং সেই কর্মকান্ড থেকে বাঙালিত্বের আত্মঅধিকার অভিযান, অত:পর ’৬৯-এ গণঅভ্যুত্থান থেকে ইতিহাস স্পষ্টই ধেয়ে গেল নিশ্চিত ‘বাংলাদেশ’ অভিমুখে। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, এই বিশাল কর্মকান্ড সেই আমাদের জন্যে। নিজ জন্মের সত্যটাকে যেন ভুলে না যাই। ত্রিশ লক্ষ মানুষের রক্তঝরা সংগ্রাম এবং তিন লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি এই বিজয় এবং বাংলার মানুষের কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা। সকলের সম্বলিত প্রচেষ্টায় গড়ে তুলতে হবে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা। এই হউক আমাদের দৃঢ় প্রত্যয়।

লেখক: প্রফেসর ড. মো. লোকমান হোসেন, সাবেক মহাপরিচালক, নায়েম, ঢাকা ।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *