বিজ্ঞান শিক্ষায় বিতর্কের ভূমিকা

পীযূষ কান্তি বড়ুয়া ::
বিজ্ঞান মানে হলো বিশেষ জ্ঞান। এ জ্ঞান চিরাচরিত পদ্ধতিতে অর্জনযোগ্য জ্ঞান নয়। বিজ্ঞানের জ্ঞান অর্জনে বিতর্কের চর্চা অপরিহার্য। কেননা, বিজ্ঞান মানেই নিরন্তর সত্যের দিকে ধাবিত হওয়ার প্রয়াস।বিজ্ঞান মানেই যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে আপাত অর্জিত জ্ঞানকে চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে দেয়া। বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীর সংজ্ঞায় সাহিত্যিক বিমল মিত্রকে বলতে শুনি, যে দুধ দেখেছে সে জ্ঞানী আর যে দুধ পান করেছে সে-ই বিজ্ঞানী। তাই বিজ্ঞানকে জানতে হলে বিতর্কের চর্চাকে করতে হবে শাণিত। কোন যুক্তি ছাড়া, কোন প্রমাণ ছাড়া বিজ্ঞান কোন সত্যকে প্রতিষ্ঠা দেয় না। পক্ষান্তরে বিতর্ক হলো এক দৃশ্যমান ও প্রদর্শনযোগ্য, যুক্তিনির্ভর বাচিক শিল্প যা পরমত সহিষ্ণুতা শিখানোর মাধ্যমে নিজের মতকে প্রতিষ্ঠার কৌশল শেখায়। এ ক্ষেত্রে অর্জিত শিক্ষাকে শাণিত করে তার প্রয়োগের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সত্যের ঝলমলে রূপকে সামনে তুলে ধরাটাই বিতর্কের উদ্দেশ্য। বিজ্ঞানের মূল পরিচয় হলো কৌতূহল। কৌতূহলী ব্যক্তির নিকট জগত ধরা দেয় রহস্যের অকূল সাগরের মতো। প্রতিটি দৃশ্যে প্রকাশিত হয় তার সংশয়,তার উচ্ছ্বাস। এই সংশয়কে দূর করে তার উচ্ছ্বাসের ঘনত্ব বৃদ্ধিতে বিতর্ক একটি উৎকৃষ্ট শিল্পমাধ্যম।
গ্রীক শিক্ষাব্যবস্থায় নগর রাষ্ট্রে সক্রেটিস-অ্যারিস্টটল প্রমুখ কালজয়ী জ্ঞানসাধকেরা ছাত্রদের মধ্যে বিতর্ককে উস্কে দিতেন। ফলে এই উস্কানিতে তৈরি হয়ে যেত জানার অনুসন্ধিৎসা। দ্বিপাক্ষিক বিতর্কের ফলে বের হয়ে আসতো বিজ্ঞান-ভিত্তিক সঠিক সমাধান।
বিজ্ঞানকে আয়ত্ব করতে হলে জিজ্ঞাসা জরুরি। কী ও কেন- এ ধরনের প্রশ্ন নিজের মনে উদ্রিক্ত করতে পারলেই বিজ্ঞান শিক্ষা হয়ে উঠবে রুচিকর। বিতর্ক বিজ্ঞানকে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে সহায়তা করে। বিতর্ক হলো সেই প্ল্যাটফর্ম যেখানে যুক্তির নৌকায় বৈতরণী পার হয় সত্য। প্রতিষ্ঠিত হয় সত্যের মহিমা। বিজ্ঞান শিক্ষায় প্রতিটা শ্রেণিকক্ষ যদি বিতর্কের মঞ্চ হয়ে ওঠে তবে হাতে-কলমে বিজ্ঞান হয়ে উঠবে নান্দনিক এবং উপভোগ্য। এতে বিজ্ঞান শিক্ষায় অনীহা একদিকে যেমন কাটবে তেমনি ঝরে পড়ার হারও রোধ হবে বহুলাংশে।
দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্রছাত্রীদের কাছে বিজ্ঞান শিক্ষাকে জনপ্রিয় করে তুলতে বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে সমকাল জাতীয় দৈনিকের ‘বিজ্ঞান বিতর্ক’ বিষয়ক প্রয়াসটি খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থীরা এর মাধ্যমে আজ বুঝতে শিখেছে, বিজ্ঞান কোন অনুকরণ বা অনুসরণের বিষয় নয়, বিজ্ঞান হচ্ছে সত্যকে বিশ্লেষণের মাধ্যমে রপ্ত করার জিনিষ। বিজ্ঞান বিতর্কের বিষয়বস্তু হিসেবে এমন কিছু সত্য বা সংশয় নির্ধারণ করা হয়েছে যার উপযুক্ত যথার্থতা নিরসন করতে পারলে দেশে বিজ্ঞান শিক্ষার মুখ্য অন্তরায়গুলো চিহ্নিত হয়ে আসবে। ফলে শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের পক্ষে বিজ্ঞান শিক্ষাকে জনপ্রিয় করে তোলার ব্যাপারে প্রসারিত দৃষ্টি দেয়া সম্ভব হবে।
আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের কিংবা শিক্ষকদের সৃজনশীলতার কোন ঘাটতি নেই। মূল ঘাটতি হলো দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক অস্থিরতা। এসব সমস্যাকে প্রশমিত ও উৎপাটিত করে সত্যিকারের বিজ্ঞান চর্চার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের স্তরে মুক্তবুদ্ধি ও নিজস্ব চিন্তাশক্তির বিপ্লব ঘটাতে হবে। প্রতিটি কোমলমতি নিউরণে চিন্তার ঝড় তুলে বিজ্ঞানের পাল উড়াতে হবে। অতীতে গুরুগৃহে বিতর্ক চর্চার অবকাশ ছিল বলেই বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। জার্নালে এক একটা আবিষ্কার সম্পর্কে প্রবন্ধ ও খুঁটিনাটি প্রকাশিত হওয়ার পর সে বিষয়ে মুক্ত বিতর্কের সূচনা সে আবিষ্কারের ত্রুটি-বিচ্যুতি বিদূরণে সহায়ক হয়েছে। আর এভাবেই হাল আমলের ঈশ্বরকণা হতে শুরু করে করোনার স্পাইক প্রোটিনেরও স্বরূপ উদ্ঘাটন করা গেছে। যদি বিজ্ঞানকে শাণিত করার জন্যে বিতর্কের অবকাশ না থাকতো তবে আজও আমরা জানতাম, সূর্যকে সাত ঘোড়ার রথে টানে বলেই দিনরাত হয় কিংবা সূর্যই পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে।
বিজ্ঞানের শক্তি যেমন অপরিমেয়, তেমনি বিতর্কের শক্তিও অনির্ণেয়। এ দুই অপার শক্তিমানের সংযোগে অতল শক্তির বৈশ্বিক কল্যাণ সাধন কোন বিষয়ই নয়। বিজ্ঞান যেমন আমাদপর আবেগ কেড়ে বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনি বিতর্কও আমাদের সংস্কার ঝেড়ে ফেলে সত্যসন্ধানী করে তুলেছে। তাই আজ সামাজিক উন্নয়নের জন্যে,নারীর ক্ষমতায়নের জন্যে এবং নারী-পুরুষের জেন্ডার বৈষম্য অপনোদনে বিতর্কের চর্চার মাধ্যমে বিজ্ঞান শিক্ষার এক অপূর্ব সময় উপনীত হয়েছে আমাদের সামনে।
আমরা আজ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের কথা বলছি। বলছি আরো- সবার জন্যে শোভন কর্মসংস্থানের। সেই পথে এগিয়ে গিয়ে দুহাজার তিরিশের এসডিজি স্টেশনে পৌঁছাতে আমাদের বিজ্ঞান শিক্ষা ও বিতর্ক চর্চাকে জনপ্রিয় করে তোলা দরকার। ‘সমকাল-এফ এফ বিজ্ঞান বিতর্ক প্রতিযোগিতা’ সময়োপযোগী এক চমৎকার উদ্ভাবন যার মাধ্যমে কুসংস্কার দূর করে বিজ্ঞানের ব্রতে এক নান্দনিক সমাজ গড়ে তোলা যাবে। আজ যেখানে সমাজকে এগিয়ে নিতে বিজ্ঞানভিত্তিক সুদৃঢ় শিক্ষাব্যবস্থা দরকার, সেখানে আমরা ক্রমশঃ ঢুকে যাচ্ছি কর্পোরেট যুগের করাল গ্রাসে। অথচ, সত্যেন বোস কিংবা জগদীশ বোস এবং কুদরাত-ই-খুদার বাংলাদেশ আজ চেয়ে আছে আগামী বাংলাদেশের ফুলকলিদের দিকে, যাদের হাতে উন্মুক্ত হবে বাংলাদেশের বিজ্ঞান সভ্যতার-বীজ। বিজ্ঞান-বিতর্কের চর্চায় মেধার মুক্তি হোক, যুক্তি উদ্বোধন হোক, শাণিত হোক চিন্তার হাতিয়ার।
বিজ্ঞান ও বিতর্কের জয় হোক। জয় হোক আগামী দিনের বাংলাদেশের সকল সম্ভাবনার।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *