মুক্তিযুদ্ধকালে চাঁদপুর বড়স্টেশন ছিল জল্লাদখানা, নারীদের ধর্ষণের জায়গা

ইব্রাহীম রনি :
চাঁদপুর প্রেসক্লাবের আয়োজনে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের আলোচনা সভায় প্রধান আলোচকের বক্তব্যে অজয় কুমার ভৌমিক বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধকালে চাঁদপুর বড়স্টেশন ছিল জল্লাদখানা। আর এই জল্লাদখানার নায়ক ছিল মেজর শওকত। তার জঘন্নতা, নির্মমতা এই চাঁদপুরবাসী দেখেছে। এখানে ধরে এনে ওয়াগনগুলোতে মানুষকে রেখে ভোর রাতের দিকে নৃশংসভাবে হত্যা করে ফেলে দেয়া হতো। রেলের ডাকবাংলোটি ছিল অগণিত মেয়েদের ধর্ষণের জায়গা। এ ইতিহাস মানুষকে জানাতে হবে। বর্তমান ও আগামী প্রজন্মকে জানানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
তিনি বলেন, মরণের ঝুকি নিয়ে সেদিনের সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সারের কথা আজো মনে পড়ে। যার লেখনীকে পাকিস্তান জমের মতো ভয় করতো। সাংবাদিকরা সমাজের আয়না এটিই সত্যি। সাংবাদিকদের লিখনীর কারণেই সেদিন জনমত গড়ে উঠেছিল।
অজয় ভৌমিক বলেন, প্রকৃত বুদ্ধিজীবীদের ১৪ ডিসেম্বর হত্যা শুরু হয়েছিল তা কিন্তু নয়, বুদ্ধিজীবী হত্যা শুরু হয়েছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুজ্জোহা হত্যার মধ্য দিয়ে। এরপর তারা এক এক করে ২৫ মার্চ রাতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪ জন শিক্ষককে হত্যা করে। ঝাকে ঝাকে ছাত্রদের হত্যা করা হয়।
তিনি বলেন, সঙ্গীত শিল্পী আলতাফ মাহমুদসহ বহু শিক্ষক, চলচ্চিত্রকার, রাজনীতিক, লেখক, ডাক্তারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের গুণীজনকে হত্যা করে। পাক হানাদাররা শুধু গুলি করে হত্যা করেছে তা নয়, বুটের আঘাতের রক্তাক্ত করে অমানবিক নির্যাতন করে জাতির সূর্য্য সন্তানদের হত্যা করা হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, শেষ মুহূর্তে কঠিন যুদ্ধ চলছে। মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে চলছে। আমেরিকার সপ্তম নৌবহর আসছে হানাদার বাহিনীকে উদ্ধার করার জন্য। কিন্তু আমেরিকা ওই বাহিনী নিয়াজিকে বললেন, আমাদের জন্য বসে থেকোন না। নিজেরা বাচতে চাইলে আত্মসর্ম্পণ করো। সেদিন আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা দুর্বার বেগে এগিয়ে চলেছে। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে, রংপুর, চট্টগ্রামে হানাদার বাহিনীর পতন। এ মুহূর্তে একটি স্ট্রাজিজি নেয়া হয়েছিল- যুদ্ধ ছাড়া যদি আত্মসমর্পণ করে তাহলে অনেক মানুষকে বাচানো যাবে। তার জন্য একটু অপেক্ষা করা হচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের রাজাকার, আলবদররা বুদ্ধিজীবীদের তালিকা করে হত্যাযজ্ঞ চালায়।
তিনি বলেন, বুদ্ধিজীবীদের তালিকা যাছাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন আছে। যেন মুক্তিযোদ্ধা তালিকার মতো না হয়।
অজয় ভৌমিক বলেন, সেদিন বাংলাদেশের ৯০ ভাগ মানুষই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল। সেদিন মানুষের মৃত্যুভয় ছিল না। প্রত্যেকটি মানুষ পাকিস্তানের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।
তিনি বলেন, এদেশ কোন দিনই স্বাধীন ছিল না। অনেকে বলেন, নবাব সিরাজুদ্দৌলা স্বাধীন বাংলার শেষ নবাব ছিলেন। এ কথাটি সম্পূর্ণ ভূল। নবাব সিরাজুদ্দৌলা বাংলার মুর্শিদাবাদের মসনদে বসেছিলেন। তিনি বাংলায় কথাও বলতে জানতেন না। তিনি বাংলার নবাবও ছিলেন না। কিন্তু ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কারণে নবাব সিরাজুদ্দৌলাকে আমরা বাংলার নবাব হিসেবেও বলেছি। সিরাজুদ্দৌলাকে নিয়ে নির্মিত ছবি মুক্তিযুদ্ধে বিরাট উপকার করেছে। মানুষ উদ্বুদ্ধ হয়েছে। তাই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৬ ডিসেম্বরই বাংলার মানুষ স্বাধীন হয়েছে। এর আগে আমরা কোনদিনই স্বাধীন ছিলাম না।
প্রেসক্লাবের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি গিয়াস উদ্দিন মিলনের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক এএইচএম আহসান উল্যাহর সঞ্চালনায় এ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চাঁদপুর পৌরসভার মেয়র মো. জিল্লুর রহমান জুয়েল, চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি গোলাম কিবরিয়া জীবন, শহীদ পাটওয়ারী, শরীফ চৌধুরী, ইকবাল হোসেন পাটোয়ারী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক রহিম বাদশা, সোহেল রুশদী, সাধারণ সম্পাদক লক্ষ্মণ চন্দ্র সূত্রধর চাঁদপুর টেলিভিশন সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি আল ইমরান শোভন, সাধারণ সম্পাদক রিয়াদ ফেরদৌসসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ এবং পৌর পরিষদের কাউন্সিলরবৃন্দ।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *