শিক্ষাই উন্নয়নের চাবিকাঠি

প্রফেসর ড. মো. লোকমান হোসেন , পরিচালক, জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম), শিক্ষা মন্ত্রণালয়

শিক্ষা মানুষের জীবনধারণ ও উন্নতির প্রধানতম নিয়ামক হিসাবে আখ্যায়িত। একদা গুহাবাসী আদিম মানুষ আজ যে বিস্ময়কর সভ্যতার বিকাশ ঘটিয়েছে তার পেছনে রয়েছে যুগ-যুগান্তরের অর্জিত জ্ঞানের প্রয়োগ। সভ্যতার বিকাশ ও প্রাচুর্য, তার মূলে রয়েছে শিক্ষার বিস্তৃৃত প্রভাব। একুশে পদকপ্রাপ্ত সমাজবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. অনুপম সেন বলেন, পৃথিবীর সকল উন্নয়নের পেছনে রয়েছে শিক্ষার অবদান। শিক্ষাই সকল উন্নয়নের চাবিকাঠি এবং উন্নয়নের হাতিয়ার। একমাত্র শিক্ষাই জাতীয় ও সামাজিক সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান দিতে পারে। শিক্ষা মানুষের জ্ঞানের দিগন্তকে প্রসারিত করে। শিক্ষাই সর্বোত্তম ও দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ যার মাধ্যমে দেশ ও জাতিকে উন্নত করা যেতে পারে। যে জাতি যত শিক্ষিত সে জাতি তত উন্নত। কেবল শিক্ষাই পারে দেশকে দারিদ্য্রমুক্ত করতে। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের শিক্ষিত জাতি দেবো।’ হাদিসে আছে ‘দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত শিক্ষা অর্জন করো।’ শিক্ষাই শক্তি, জ্ঞানই আলো, শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড।

মানুষ পৃথিবীতে আসার পর থেকে তার প্রয়োজন মিটানোর জন্য যেসব জ্ঞান, কলাকৌশল, মূল্যবোধ ও গুণাবলি অর্জন করে থাকে তাকে বলা হয় শিক্ষা। বিভিন্ন মনীষী বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষার সংজ্ঞা দিয়েছেন। সমাজতাত্ত্বিকগণের মতে বস্তুগত এবং সমাজজীবনের নিয়মসমূহ, তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক, সম্পদ, যোগসূত্র সম্পর্কিত জ্ঞান আয়ত্ত করার পদ্ধতিকে বলা হয় শিক্ষা। এক সময় শারীরিক সামর্থ্য কোনো জাতির গর্বের বিষয় থাকলেও বর্তমান জ্ঞানবিজ্ঞানের বিস্ময়কর উন্নতির যুগে জাতীয় জীবনে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষাকে গুরুত্ব দিলে দেশ এগোবেই। মানুষেরা যত দিন শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত থাকবে, জাতির দুর্দশা ততই প্রবলতর হতে থাকবে, মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করবে, সেই সাথে জাতির অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি হবে। যে জাতি শিক্ষা-দীক্ষায় উন্নত, সে জাতির জ্ঞান-বিজ্ঞান, শৌর্য-বীর্য ও প্রভাব-প্রতিপত্তি তত বেশি। প্রাচীন গ্রিক জাতি তাঁদের শিক্ষাদীক্ষার জন্যই চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। শিক্ষাবিবর্জিত মানুষ জাতিকে ন্যুব্জ, গর্বহীন, দীপ্তিহীন অবস্থায় পরিনত করে। বস্তুত, শিক্ষার প্রসারই পারে জাতিকে গতিশীল করতে, সমস্যা মোকাবেলায় সক্ষম করে তুলতে, আশা ও স্বপ্ন দেখার সাহস যোগাতে। তাই ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিহার্য।

শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য তিনটি- যার প্রথমটি হলো মানুষের দৈহিক ও মানসিক দক্ষতা বৃদ্ধি, দ্বিতীয়টি হলো ব্যক্তির ভিতর মানবীয় গুণাবলির বিকাশ এবং তৃতীয়টি হলো মানুষকে সার্বজনীন ও শাশ্বত প্রেরণা প্রদান। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন। শিক্ষা এমন এক মাধ্যম যার সাহায্যে মানবসম্পদের উন্নয়ন ঘটে। শিক্ষা মানুষের জ্ঞান, অভ্যাস, আচার-আচরণ ও মূল্যবোধকে প্রভাবিত করে। শিক্ষা একদিকে যেমন মানুষের জ্ঞানের ভাণ্ডারকে পরিপূর্ণ করে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক দৈন্য এড়াতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

নিরক্ষর ব্যক্তি কিংবা তার পরিবারের অন্যান্য সদস্য কম উৎপাদনশীল হয়; কম আয়ের কাজে নিযুক্ত থাকে এবং দারিদ্যসীমার নিচে বসবাস করে। তারা পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদন বাড়াতে পারে না ফলে তাদের জীবনযাত্রার মান নিচু হয়। শিক্ষা মানুষের বুদ্ধিগত পরিসর ও বৈষয়িক সম্পদ বৃদ্ধি করে; মানুষের মননশীলতার উন্নয়ন ঘটায় এবং সময়োপযোগী প্রয়োজনীয় কারিগরি ও উদ্ভাবনী দক্ষতার উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষকে সম্পদে পরিণত করে। অর্থনীতিবিদ এ্যাডাম স্মিথ সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে শিক্ষার গুরুত্বকে অপরিহার্য বলে দাবি করেছেন। মানবসম্পদ উন্নয়ন একটি মৌলিক পরিবর্তন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একটি সমাজের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং ভৌত কাঠামোর পাশাপাশি সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধ ও জীবনধারণ পদ্ধতির ক্ষেত্রে পরিবর্তন সাধিত হয়। দেখা গেছে শিক্ষিত পরিবার-প্রধানের আয় অশিক্ষিত পরিবার-প্রধানের আয় থেকে কয়েক গুণ বেশি। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত নয় এমন ব্যক্তির চেয়ে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তির আয় ৫২.৬% বেশি। মাধ্যমিক শিক্ষায় যারা শিক্ষিত নন এমন ব্যক্তিদের তুলনায় এই পর্যায়ে শিক্ষিতরা ৭.২% বেশি আয় করে থাকেন আর উচ্চতর পর্যায়ের শিক্ষিতরা মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষিতদের চেয়ে ১৬.২% বেশি আয় করে। এ থেকেই বোঝা যায় কর্মক্ষেত্রে ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে শিক্ষার ভূমিকা। দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হলে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক।

সাম্প্রতিক সময়ে গুণগত শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং শিক্ষার আধুনিকায়ন ইত্যাদি বিষয় ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। পরিমাণগত নয়, গুণগতমানের শিক্ষা সুনিশ্চিতকরণ এখন সময়ের দাবি। বিশেষত কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তির আগমনের কারণে সার্বজনীন শিক্ষা এখন দেশ ও জাতির গণ্ডি ছাড়িয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা মানুষকে উৎপাদন কলাকৌশল সম্পর্কে জ্ঞান দান করা ছাড়াও উন্নয়নের সহায়ক দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি করে থাকে। জনগণকে উন্নত জীবনযাপনে উৎসাহী করে জীবনবোধ জাগ্রত করে, মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান দান করে থাকে, যা সুষম উন্নয়নের সহায়ক উপাদান হিসাবে কাজ করে।

১৯৯১ সালে মানব-উন্নয়নের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সনাক্ত করা হয়। এগুলো হলোমানুষের উন্নয়ন, মানুষের দ্বারা উন্নয়ন এবং মানুষের জন্য উন্নয়ন। মানুষের উন্নয়ন হলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং সামাজিক কল্যাণে বিনিয়োগ করা। উন্নয়নে পূর্ণ অংশগ্রহণ ও প্রয়োগ হলো মানুষের দ্বারা উন্নয়ন। প্রতিটি মানুষের চাহিদা, আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হলো মানুষের জন্য উন্নয়ন। উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির লোকদের মধ্যে আয়ের বৈষম্য থাকলেও জনসংখ্যার বিরাট অংশই খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের ন্যূনতম মান বজায় রেখে চলছে। সব লোকেরই ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা রয়েছে, পুষ্টির মান ভালো হওয়ায় জনগণ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, গ্যাস, টেলিফোনএসব অবকাঠামোর অবস্থা ভালো। এক্ষেত্রে মালয়েশিয়াকে উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে। দেশটির অবস্থা প্রথমে বাংলাদেশ থেকে খুব বেশি উন্নত ছিল না। তখন আমাদের মাথাপিছু আয় ছিল ওদের দ্বিগুণ। অথচ এখন তাদের মাথাপিছু আয় আমাদের থেকে কয়েক গুণ বেশি। এর একমাত্র কারণ হলো তাদের সরকার শিক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।

কোন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মানবসম্পদ হচ্ছে সবচেয়ে বড় পুঁজি। শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তিকে বলা হয় মানব মূলধন। কারিগরি শিক্ষা দিয়ে জনগণকে দক্ষ করে তুলতে পারলে তা হবে সবচেয়ে বড় পুঁজি। উন্নয়নে শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ১৯০৯ সাল হতে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত সময়ে আমেরিকার অর্থনৈতিক উন্নয়নে শিক্ষা ২৩% অবদান রেখেছে। শিক্ষাখাতের ব্যয়কে এখন আর ব্যয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয় না। অন্যান্য খাতে পুঁজি খাটালে যে লাভ হয়, শিক্ষাখাতে তার চেয়ে অনেক বেশি লাভ হয়। অর্থাৎ শিক্ষায় বিনিয়োগ হলো সর্বোৎকৃষ্ট বিনিয়োগ। বড় বড় শিল্প কারখানায় বিনিয়োগের চেয়ে শিক্ষায় বিনিয়োগ অধিকতর লাভজনক। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন অশিক্ষার অন্ধকার থেকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠিকে মুক্ত করতে না পারলে দেশের শ্রীবৃদ্ধি বেগবান করা অসম্ভব। তবে মানুষকে তিনি নিছক পুঁজি হিসাবে দেখতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন মানবমঙ্গলের মাধ্যমে অর্থনৈতিক বিকাশ ঘটুক। দক্ষ জনশক্তি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ছাড়া এ জটিল অর্থনৈতিক যুগে কোনো দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। বস্তুগত পুঁজি গঠনের সাথে সাথে মানবপুঁজি গঠনও প্রয়োজন, যা প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে তরান্বিত করবে।

একটি দেশ প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর হতে পারে, তার মানে এই নয় যে দেশটি সমৃদ্ধিশালী হবে। বিশ্বের অনেক দেশ রয়েছে, যাদের প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ, কিন্তু তারা বিশে^র বুকে উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেনি। যেমন- আফ্রিকার ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো বা সুদানের কথা বলা যেতে পারে। নাইজেরিয়া পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ। অ্যাঙ্গোলাও তেলসমৃদ্ধ, কিন্তু দরিদ্র। লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম দেশ। সেখানে শিক্ষাকে গুরুত্ব না দেয়ায় দেশগুলোতে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি হয়নি। প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগানোর জন্য দরকার কারিগরি জ্ঞান, দক্ষ জনবল ও একটি উদ্যমী সরকার। সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, নরওয়ের মতো দেশে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগিয়েছে। অন্যদিকে প্রাকৃতিক সম্পদ নেই, যেমন- জাপান, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর প্রভৃতি রাষ্ট্র গুরুত্ব দিয়েছে মানবসম্পদ উন্নয়নে। এ দেশগুলো শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। মেইজি সরকার ক্ষমতায় আসার আগে জাপানের অবস্থাও বাংলাদেশের মতো ছিল। কিন্তু চাহিদাভিত্তিক শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল দেশটি। ১৮৭৭ সালে জাপানের টোকিওতে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৮০ সালে সেখান থেকে প্রথম গ্র্যাজুয়েটরা বের হয়। এ গ্র্যাজুয়েটদের ৯০ শতাংশই ছিল পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা, গণিত ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে পাস করা। কারণ সে সময় দেশটিতে এদের প্রয়োজন ছিল সবচেয়ে বেশি। তাই শুধু শিক্ষার হার বাড়ালেই হবে না। জানতে হবে একটি দেশে কী ধরনের শিক্ষা প্রয়োজন।

প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নির্ভর করে মানবসম্পদের দক্ষতা ও প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞানের উপর। আমাদের যথেষ্ট প্রাকৃতিক সম্পদ আছে। কিন্তু এগুলোর অনুসন্ধান ও আবিষ্কার এবং ব্যবহার করার মতো বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ নেই বলে বিদেশিদের উপর নির্ভর করতে হয়। আমাদের কী আছে, কী নেই আমরা তা বলতে পারছি না। বিদেশি বিশেষজ্ঞ যা বলে আমরা তা মেনে নেই। যথেষ্ট মেধা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও ক্ষমতাসম্পন্ন লোকের অভাব হলে প্রকৃতিকে ব্যবহার করা যায় না এবং উন্নয়নের সিঁড়িতেও পা ফেলা যায় না। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রধানত যে বিষয়গুলোর প্রয়োজন হয় সেগুলো হচ্ছে: (ক) মানবসম্পদ (খ) প্রাকৃতিক সম্পদ এবং (গ) বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তি জ্ঞান। আধুনিক অর্থনীতির উন্নয়নের এই ধারণা ও তত্ত্বকে প্রয়োগ করে বিভিন্ন দেশ বিভিন্নভাবে উন্নত হয়েছে। এই তত্ত্বের ভিত্তিতে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত, মানবসম্পদের এই তত্ত্বকে ব্যবহার করে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, হংকং, সিঙ্গাপুর, চীন, মালয়েশিয়া উন্নত রাষ্ট্রে পরিনত হয়েছে। এক সময় এসব দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ছিল সীমিত। দ্বিতীয়ত, প্রাকৃতিক সম্পদের এই তত্ত্বকে ব্যবহার করে যেসব রাষ্ট্র উন্নত হয়েছে, তাদের মধ্যে আছে সৌদি আরব, ইরান, কাতার, লিবিয়াসহ তেলসমৃদ্ধ দেশসমূহ। এদের জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ ছিল সীমিত। তৃতীয়ত, জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও প্রাকৃতিক সম্পদ এই তত্ত্বকে ব্যবহার করে যেসব রাষ্ট্র উন্নত হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি; এদের মানবসম্পদ ছিল খুব সীমিত। উন্নয়ন মডেলের এই ৩টি ধারার প্রথমটি বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য। কারণ আমাদের আছে মানবসম্পদের প্রাচুর্য আর তাকে ব্যবহার করেই আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে অগ্রসর হতে হবে।

২০০০ সালের এপ্রিল মাসে সেনেগালের রাজধানী ডাকারে বিশ্ব শিক্ষা ফোরাম অনুষ্ঠিত হয়। ‘সবার জন্য শিক্ষা’ সম্পর্কিত এটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্ব সম্মেলন। এ সম্মেলনে সবার জন্য শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নের তাগিত দেয়া হয়। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম ও যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘মারসা’র প্রতিবেদনে বলা হয় ‘শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টিতে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের হার ৪৭%। শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টিতে দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলঙ্কা ও ভুটানের পরে রয়েছে বাংলাদেশ। নিম্ন আয়ের দেশগুলোর মধ্যে তাজাকিস্তান ও কম্বোডিয়ার পর বাংলাদেশের অবস্থান। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের ২৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সীদের ৮২ শতাংশ কর্মে নিয়োজিত থাকলেও এর মধ্যে মাত্র ৬.৩ শতাংশ উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন। দেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি অনীহার কারণে এ হার শতকরা ১৭ ভাগ। অথচ বিশ্বচ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দক্ষ জনশক্তির হার বৃদ্ধির বিকল্প নেই। উন্নত দেশসমূহে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার হার ২৫ থেকে ৭৫ ভাগ। যে দেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার হার যত বেশি সে দেশ তত উন্নত। জাপান, গণচীন, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন উন্নত দেশের নাম উল্লেখ করা যায়।

মানব জাতির উন্নতি এবং কল্যাণে বস্তুগত শিক্ষার চেয়ে আদর্শশিক্ষা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। শিক্ষার মাধ্যমে জ্ঞান আহরিত হয় এবং এ আহরিত জ্ঞানই মূল্যবোধ সৃষ্টির মাধ্যম। নিষ্ঠা, সততা, ন্যায়বোধ, দেশাত্মবোধ, সহমর্মিতা, সৃষ্টিকর্তার প্রতি আনুগত্য ইত্যাদি নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ মানবকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। যে শিক্ষা মানবীয় গুণাবলির বিকাশ ঘটায় না সে শিক্ষা ব্যর্থ, অন্তঃসারশূন্য। নারীশিক্ষার অগ্রপথিক বেগম রোকেয়া বলেছেন, ‘ঈশ্বর যে স্বাভাবিক জ্ঞান ক্ষমতা দিয়েছেন সেই ক্ষমতাকে অনুশীলন দ্বারা বৃদ্ধি করাই শিক্ষা’। শিক্ষা মানুষকে চিন্তা করতে শেখায় আর এ চিন্তা মানুষের জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে। সক্রেটিস বলেছেন, Know thyself; নিজেকে জানাই শিক্ষা। নিজেকে জানার মধ্যে অপরকে জানার এবং সৃষ্টিকর্তাকে জানার সুযোগ বিদ্যমান। অ্যারিস্টটল মনে করতেন মানুষিক ও অধ্যাত্মিক জীবনের চরম বিকাশসাধনই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য, কাজেই শিক্ষা মানেই জীবনজিজ্ঞাসা। তাই বলা হয় ‘Education is for self realization’।

বাংলাদেশে কারিগরি জ্ঞানে দক্ষ জনবলের অভাবেই দেশের শিল্পকারখানা খাতে প্রতি বছর ছয়শত কোটি ডলার বা প্রায় সাতচল্লিশ হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। এ সমস্যার মূলে রয়েছে কারিগরি বিষয়ের দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্ভাবনখাতে বিনিয়োগের স্বল্পতা। দেশের ষাট শতাংশের বেশি মানুষের বয়স পঁয়ত্রিশ বছরের নিচে হলেও কারিগরি দক্ষতা ও জ্ঞানের অভাবে এদেরকে শিল্পখাতে নিয়োগ করা যাচ্ছে না। এই কর্মীদের প্রায় চুয়াল্লিশ শতাংশের কর্মসংস্থান হচ্ছে কৃষিতে আর প্রায় ৩৭ শতাংশ সেবাখাতে। কিন্তু কৃষি আর সেবাখাতে জনসংখ্যার আধিক্য শিল্পখাতকে এগিয়ে নেয়ার পক্ষে সহায়ক নয়। তবে রূপকল্প ২০২১ এবং ২০৪১ সালকে সামনে রেখে এখন শিল্পকারখানায় কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এর লক্ষ্য হলো নারীকে সচেতন ও প্রত্যয়ী করা এবং সম-অধিকারের অনুকূলে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রখর করা; সকল পর্যায়ে অংশগ্রহণে নারীকে উদ্বুদ্ধ ও দক্ষ করা; দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ও দারিদ্র্যবিমোচনে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা; আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নসাধনে ভূমিকা পালন করা। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মালিতে যেসব মেয়েরা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেছে তাদের সন্তানসংখ্যা গড়ে তিনজন, অপরদিকে যারা শিক্ষত নন তাদের সন্তানসংখ্যা গড়ে ৭ জন। শিক্ষার মাধ্যমে মেয়েদের অর্থ উপার্জনের সামর্থ্য বৃদ্ধি পায়। তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি পায়, তারা কর্মে নিয়োজিত হয়, ফলে নারীর ক্ষমতায়ন হয়। শিক্ষা ব্যক্তির কর্মদক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে। নারী শিক্ষিত হলে পরিবারে প্রজনন হার হ্রাস পায়; উৎপাদনশীল কাজে বেশি সময় ব্যয় করতে পারে।

ইউনেস্কোর মতে, মাত্র এক বছর প্রাথমিক শিক্ষাশেষে নারীদের আয় প্রায় ২০% বৃদ্ধি পায়। ছেলে এবং মেয়ে উভয়কেই যখন শিক্ষার জন্য সমান সুযোগ দেয়া হয় তখন জিডিপি বৃদ্ধি পায়। স্কুলে মেয়েদের সংখ্যা ১০% বৃদ্ধি পেলে ৩% হারে জিডিপি বাড়ে। মেয়েদেরকে যখন সমান অধিকার ও স্কুলে যাবার সমান সুযোগ করে দেয়া হয় তখন তারা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারে। অর্থ উপার্জনের ক্ষমতা ও আয় বৃদ্ধির ফলে তারা দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে পুরো পরিবারের জন্য খাদ্য ও বস্ত্রের সংস্থান করতে পারে।

এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকার বিভিন্ন দেশে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে শিক্ষার সাথে উন্নয়নের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এ মহতী কাজের জন্য আর্থার সোল্‌জ, গ্রে বেকার, এম ফ্রিডম্যান, অমর্ত্য সেনসহ অনেকে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। শিক্ষা, মানবসম্পদ ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন আধুনিক বিশ্বে একটি স্বীকৃত বিষয়, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া। শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল অর্থ উপার্জনই নয়, ব্যক্তির চরিত্রের বিকাশও বটে। এটা নানাভাবে প্রমাণিত যে, শিক্ষা এবং উন্নয়নের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। শিক্ষা প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সাথে জড়িত হয়ে শিক্ষা জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যেমন- শিক্ষায় প্রচুর বিনিয়োগ করে হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান অর্থনৈতিক উন্নয়নে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে পূর্ব এশিয়ার এই দেশগুলো হতে পারে বড় উদাহরণ। মানবপুঁজির উন্নয়নে শিক্ষায় বিনিয়োগ তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হয়েছে। শিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতার ফলেই চীন তার বিশাল জনগোষ্ঠীকে সম্পদে রূপান্তর করে শিল্পায়নে ইউরোপ-আমেরিকার সঙ্গে পাল্লা দিতে শুরু করেছে।

যে কোনো ধরনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে অন্যতম প্রধান পুঁজি। যেমন- অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে জাপানের আবির্ভাবের পূর্বে তাদের শিক্ষার হার ও মান ছিল অতি উঁচু। সঙ্গত কারণেই বলা যায়, শিক্ষায় প্রয়োজনীয় ও পরিকল্পিত বিনিয়োগ একটি জাতির অবস্থা কিভাবে পাল্টে দেয় তার একটি সফল গল্প হচ্ছে আমাদের এশিয়ার দেশ জাপান। বহু আগে জাপান শিক্ষাকে বিশাল পুঁজিতে রূপান্তরিত করেছে। শত ভাগ শিক্ষিত জাপানিদের অর্থনৈতিক সম্পদের মধ্যে ১ শতাংশ প্রাকৃতিক পুঁজি, ১৪ শতাংশ ভৌত বা বস্তুগত পুঁজি এবং ৮৫ শতাংশ শিক্ষা সংক্রান্ত মানবিক ও সামাজিক পুঁজি। শিক্ষায় বিনিয়োগে Rate of Return অধিক। সর্বদা শিক্ষিত শ্রমশক্তির আয় অধিক হয় বিধায় সব অবিভাবকই তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠান। বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের উপর গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষার Rate of Return ১৮ শতাংশ বা তার উপর। মালয়েশিয়ায় এক গবেষণায় দেখা গেছে, এক বছরের বাড়তি শিক্ষায় একজন কৃষক ২ থেকে ৫ গুণ কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারেন। কারণ অধিকতর শিক্ষায় কৃষকদের দৃষ্টিভঙ্গি উন্নত হওয়ার কারণে তারা সৃজনশীল হয়, নতুন পদ্ধতির প্রতি আগ্রহী হয়। যে সকল কৃষক শিক্ষা নিয়েছেন তারা কৃষিক্ষেত্রে সার ও প্রযুক্তি ব্যবহারে তুলনামূলকভাবে বেশি সফল। প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করার জন্য যে উদ্ভাবনী শক্তি প্রয়োজন তা শিক্ষার মাধ্যমেই অর্জিত হয়। অর্থনৈতিক কল্যাণসাধনের লক্ষ্যেও শিক্ষা অপরিহার্য। কাজেই শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মানুষের জীবিকার প্রয়োজন মিটানো। শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন ব্যতিরেকে জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের প্রধান মাপকাঠি হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষার অধিকার পরিপূর্ণভাবে অর্জিত হলে জনসাধারণের অন্যান্য অধিকার আদায়ের পথ সুগম হবে।

যে জাতি শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয় সে জাতি কখনো পিছিয়ে পড়ে থাকে না। প্রায় ৩ দশকের যুদ্ধে বিধ্বস্ত ভিয়েতনাম শিক্ষাখাতে জিডিপি-র ৬.৬ শতাংশ বিনিয়োগ করে প্রতিযোগিতায় বিশ্বে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। সেখানে আমাদের বিনিয়োগ দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। বাংলাদেশের চেয়েও দরিদ্র দেশ ইথিওপিয়া, তাদের শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ৪.৭%। ইউনেস্কোর হিসাব অনুসারে শিক্ষাখাতে আমাদের ব্যয় ৬.৬% হওয়া উচিত। সারাবিশ্বে যখন শিক্ষা বাজেট বাড়ছে আমাদের তখন ক্রমেই কমতে শুরু করেছে। অথচ দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য শিক্ষাকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। ভারত ও নেপালে শিক্ষাখাতে মোট দেশজ সম্পদের ৪%, শ্রীলংকায় ৫% এর বেশি, ভুটানে ৫%, মালয়েশিয়ায় ৮%, দক্ষিণ কোরিয়ায় ১০%, সিঙ্গাপুরে ১২%, ব্রাজিল এবং চিলিতে ৪% এর মতো।

বর্তমান সরকার সমাজের সকল স্তরের মানুষের মতামত গ্রহণ করে জাতির প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি, আকাক্সক্ষা ও লক্ষ্যের প্রতিফলন ঘটিয়ে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে এটি বাস্তবায়ন করতে হলে শিক্ষাখাতে অধিকতর বাজেট বরাদ্দ দেয়া আবশ্যক। আমরা আশা করি বর্তমান সরকারের ভিশন-২০২১ বাস্তবায়ন ও ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রের পর্যায়ে উন্নীত করতে শিক্ষকসমাজের ন্যায্য পাওনা অবশ্যই সুনিশ্চিত করতে হবে। ২০০ বছর ব্রিটিশ, ২৪ বছর পাকিস্তান এবং স্বাধীনতার পর ৫০ বছর ধরে মানুষ শিক্ষা, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের জন্য সংগ্রাম করছে। এখনও প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী শিক্ষাহীন, অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে এবং কৃষির উপর নির্ভরশীল, চাকরির বাজার সীমিত, মাথাপিছু আয় নগণ্য। শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দেশের কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যে প্রভূত উন্নতি হয়েছে। কিন্তু একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের নীতি-নির্ধারকেরা যদি কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসনে যথাযথ ও উপযুক্ত পরিকল্পনা নিতেন ও বাস্তবায়নে সৎ ও আন্তরিক থাকতেন তাহলে দেশ আরও অগ্রসর হতো।

বাংলাদেশ সরকার উন্নয়নের কোন মডেল অনুসরণ করতে চায় তার একটি পরিষ্কার রোডম্যাপ থাকা জরুরি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান যখন আণবিক বোমায় বিধ্বস্ত, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে তাদের সময় লেগেছিল মাত্র ৫ বছর, তারা তাদের জিডিপিকে ফের আগের অবস্থানে অর্থাৎ যুদ্ধপূর্ব অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিল। সেটা সম্ভব হয়েছিল তাদের দক্ষ মানবসম্পদ, জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির কারণে। ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপড়েনে জাপানের বৃহৎ পুঁজির বিনিয়োগ, শিল্প ও বাণিজ্য চীন থেকে স্থানান্তরিত হচ্ছে পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। বাংলাদেশের উন্নয়ন যেভাবে এগুচ্ছে তাকে একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় উন্নয়নের মূল সড়কে তোলার কাজটি এখন একটি চ্যালেঞ্জ। এর জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত নীতি ও শিক্ষায় যথাযথ বিনিয়োগ নিশ্চিত করা। সুতরাং বাংলাদেশের উন্নয়ন নির্ভর করছে মূলত দক্ষ জনশক্তির উপর। বিশ্বব্যাংক (২০০০), ইউএনডিপি (২০০০), ইউনেস্কো (১৯৯৯) সালে তাদের সবার রিপোর্টেই বলেছে মানবসম্পদের উন্নয়ন ও ব্যবহার ছাড়া বাংলাদেশের উন্নয়নের আর কোনো পথ খোলা নেই।

লেখক: প্রফেসর ড. মো. লোকমান হোসেন, পরিচালক, নায়েম, ঢাকা ।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *