১৫ আগস্ট ১৯৭৫ বাঙালি জাতির সব হারানোর দিন

” একজন মানুষ হিসাবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েইআমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসাবে যা কিছু বাঙালিদের সাথে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীর ভাবে ভাবায়। এই যে নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালবাসা,অক্ষয় ভালবাসা,যে ভালবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে”
অসমাপ্ত আত্মজীবনী
– শেখ মুজিবুর রহমান।

আগষ্ট মাস শোকের মাস,কষ্টের মাস,হৃদয়ের রক্তক্ষরনের মাস,প্রিয়জন হারানোর মাস বাঙালী জাতিকে নিয়ে গভীরভাবে ভাববার কালজয়ী মহাপুরুষ সহ পরিবারের সকল কে হারানোর মাস।।

সূর্য যেমন তার অফুরন্ত দীপ্ত রশ্মি জ্বেলে সমগ্র বিশ্বকে উদ্ভাসিত করে তেমনি বাঙালী জাতিকে নিজস্ব সত্তা নিয়ে মাথা সোজা করে দাঁড়ানোর জন্য সূর্যের ন্যায় আলোক বর্তিকা হাতে এসেছিলেন সে মহাপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাসের মহানায়ক তিনি। বাংলাদেশ নামক স্বাধীন বদ্বীপ সৃষ্টিতে তাঁর অবদান অস্বীকার করার অর্থ হলো নিজের জন্মকে ও অস্তিত্ব অস্বীকার করা। বাংলাদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি বার বার কারা বরন করেছেন চার হাজার ছয়শত বিরাশি দিন,প্রিয়জনকে না পাওয়ার বেদনায় বেদনাতুর ছিলো তাঁর পরিবার ও গোটা বাংলাদেশ ।।

১৯৪৩ সন থেকে স্বকীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহন করার পর থেকেই তাঁর চিন্তা,চেতনায় ছিলো অসহায় দুঃখী বাঙালিকে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করে মানুষের মৌলিক অধিকার গুলো নিশ্চিত করা। তিনি করেছিলেন ও তাই। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে বাঙ্গালি জাতি যার কিছু আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পরেছিলো মহান মুক্তি যুদ্ধে।ত্রিশ লক্ষ প্রানের বিনিময়ে আড়াইলক্ষ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা।।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ যখন এগিয়ে চলছে উন্নয়নের পথে সে সময় স্বাধীনতার ৩ বছর সাত মাসের মাথায় দেশী ও বিদেশীদের চক্রান্তে ১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগষ্ট সেনাবাহিনীর একদল ক্ষমতা লিপ্সু,বিপথগামী হায়েনার দল স্বপরিবারে হত্যা করে বাঙ্গালী জাতির প্রান বাংলাদেশ ও স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান কে এবং পরিবারের ২৬ জন সদস্যকে। এ হত্যা কান্ডের মাধ্যমে বাঙ্গালি জাতির কপালে এঁকে দেয় তারা কলংকের তিলক।

ঘাতকদের মূল টার্গেট ছিলো বঙ্গবন্ধু পরিবার। নিকটাত্মীয়দের সহ ২৬ জনকে নৃশংস ভাবে হত্যা করে বাঙ্গালি জাতির ইতিহাসে কালো অধ্যায়ের রচনা করলো তারা। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব,তিন পুত্র শেখ কামাল,শেখ জামাল,শিশু মাসুম বাচ্চা শেখ রাসেল,পুত্র বধু রোজী জামাল,সুলতানা কামাল, বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, ভাগ্নে যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মনি,তার অন্তঃসত্তা স্ত্রী আরজু মনি, ভগ্নিপতি আব্দুর রবি সেরনিয়াবাত,তার কন্যা বেবী,পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত নাতি সুকান্ত বাবু,সজীব সের নিয়া বাদ,আত্মীয় সেন্টু খান,এস বি অফিসার সিদ্দিকুর রহমান,কর্নেল জামিল,সেনা সদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হক কেউ বাদ যায়নি তাদের পৈশাচিকতা থেকে।
তবে কথায় আছে রাখে আল্লাহ মারে কে? বঙ্গবন্ধু কন্যা আমাদের স্বপ্ন সারথি,আমাদের বাতিঘর,বাঙ্গালী দের অন্তঃ প্রান মাননীয় প্রধানমত্রী শেখ হাসিনা এবং ছোট বোন শেখ রেহানাকে আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলেন অকৃতজ্ঞ বাঙালি জাতির হাল ধরার জন্য।

১৯৭৫ এর ১৫ই আগষ্ট স্ব পরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেই বন্ধ থাকেনি গভীর ষড়যন্ত্র। খুনী জিয়া, মুশতাকের দল অসাংবিধানিক উপায়ে অবৈধ পথে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেই বঙ্গবন্ধুর বিচার প্রক্রিয়া বন্ধকরতে পাশ করে ঘৃন্য, জঘন্য, কালো আইন ইন্ডিমিনিটি বিল।
তারা জাতির পিতার খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকুরী দিয়ে,পদায়িত করে আশ্রয়, প্রশ্রয় দিয়ে পুরস্কৃত করেছে।

পারেনি নিকৃষ্ট,ক্ষমতালিপ্সুর দল তাদের কাল আইনকে কার্যকর করতে। বাঙালি জাতির দিশারী বঙ্গবন্ধু কন্যা সরকার গঠন করে ঘৃন্য জঘন্য কালো আইনটি বাতিল করেন এবং শুরুহয় বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া। বঙ্গবন্ধুর নিবেদিত প্রান বিজ্ঞ আইনজীবী গন সুন্দর ভাবে দক্ষতার সাথে মামলা পরিচালনা করেছেন, ঘাতকদের বিচার হয়েছে, ফাঁসি কার্যকর হয়েছে।বিচারের রায় কার্যকর হওয়ায় বাঙ্গালি কিছুটা হলেও দায়মুক্ত। বর্তমানে কিছু পলাতক বিভিন্ন দেশে ফেরারী হয়ে পালিয়ে আছে তাদের ফাঁসির রায় কার্যকর করার মাধ্যমেই জাতি সম্পূর্ন দায় মুক্ত হতে পারে।

১৫ ই আগষ্ট জাতীয় শোকের দিন।। এ শোক আজ শক্তিতে রূপান্তরিত।। বঙ্গবন্ধু কন্য শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমত্রী। তিনি বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত করছেন।
দেশ আজ এগিয়ে যাচ্ছে উন্নয়নের দুর্বার গতিতে।কিছু চোর,দূর্নীতিবাজ, অসৎ লোক না থাকলে দেশ আজ বিশ্বের অন্যতম উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরিত হতো।। স্বপ্নের পদ্মা সেতু চলাচলের অপেক্ষায়,নিজস্ব অর্থায়নে ৪৫০ টি মডেল মসজিদ নির্মান, সোয়া লাখ গৃহহীনে গৃহ দান,জমি দান, মেট্রোরেল,বিদ্যুতের স্বয়ংসম্পূর্নতা, পাতাল ট্রেন , ডিজিটাল বাংলাদেশে ইন্টারনেট সুবিধা, এ করোনা সময়েও শতভাগ শিক্ষায় সফলতা, দারিদ্র সংকট মোকাবিলা,নারীর ক্ষমতায়নও সফল বাস্তবায়ন,কাউকে অপরাধে ছাড় না দেয়া, গোদের উপর বিষফোঁড়া দশলাখ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দান, মাদক বিরোধী অভিযান,সন্ত্রাস ও জঙ্গী বিরোধী অভিযান, দূর্নীতে জিরোটলারেন্স,এক কোটি বাঙ্গালীকে করোনা প্রতিরোধ টিকা প্রদান সহ সব ক্ষেত্রেই তিনি সফল। সব কিছুতেই সজাগ ও সুক্ষ দৃষ্টি রয়েছে স্বপ্ন দ্রষ্টা মাননীয় প্রধান মন্ত্রী হাসিনার।
সব শুভদৃষ্টি, সব ভালবাসা, সবটুকু স্নেহ অসহায় বাঙালীর জন্য।। তিনি শুধু সরকার প্রধানই নন তিনি মানবিক গুন সম্পন্ন অনন্য ও অসাধারন এক ব্যক্তিত্ব।।গন মানুষের নেতা বলেই একজন মানুষকে ও এ করোনা মহামরীতে না খেয়ে মরতে হয়নি, বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়ন দেশের চেয়ে কোন অংশে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশ।
জাতিকে মিথ্যা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না করে সবাই সত্যকে তুলে ধরুন।সবাই নিজে করোনা প্রতিরোধ টিকা গ্রহন করুন,অন্যকে উদ্বুদ্ধ করুন।
১৫ ই আগষ্টের এই দিনে শ্রদ্ধা ভরে স্মরন করছি এই দিনে নিহত মহান শহীদ দের, সারা পৃথিবী আজ শ্রদ্ধা ভরে স্মরন করছে স্বাধীনতার মহান নেতাকে। এ শোক আজ মহাশক্তি,সে শক্তিতে দূর্বার গতিতেএগিয়ে চলুক সুজলা সুফলা শস্য শ্যমলা,শ্যাম শকুন্তলা,সাগর মেঘলা আমার সোনার বাংলাদেশ।
শোক দিবসে সবার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। সকল মহান শহীদদের আল্লাহ পাক জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন।
বিশ্বকবি রবীন্দ্র নাথের ঠাকুরের ভাষায় বলতে হয়।
” তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারই দান
গ্রহন করেছো যত ঋনী ততই করেছো আমায়।।
জয়বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।

লেখক : জেসমিন সুলতানা, এডভোকেট বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.