৩ মার্চ হইতে ৬ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৬টা হইতে দুপুর ২টা পর্যন্ত সমগ্র প্রদেশে হরতাল পালন করুন : বঙ্গবন্ধু

মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান :
মার্চের ৩ তারিখে রাজধানী ঢাকা ভয়াল গর্জনে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। ঢাকার আকাশে-বাতাসে মুহুর্মুহু শ্লোগান, চোখে মুখে শানিত দৃষ্টিÑ বাংলার দাবি মানতেই হবে, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ঘোষণা করতে হবে। সেই তপ্ত সাহারায় কান্ডারী বঙ্গবন্ধুর প্রত্যেকটি বাক্য, প্রত্যেকটি চিন্তা যে জীবন্ত ইতিহাস। ওইদিন দৈনিক ইত্তেফাক বঙ্গবন্ধুর ৩টি সংবাদ পরিবেশন করে। ৩ কলামবিশিষ্ট সংবাদের মধ্যে প্রথমটি প্রথম লিড, দ্বিতীয়টি দ্বিতীয় লিড, তৃতীয়টি শেষ পৃষ্ঠায় ছাপা হয়। সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের বিক্ষোভ মিছিলের ছবি প্রথম পৃষ্ঠায় ৫ কলাম ও ছাত্রদের ডাকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত জনসভার ছবি শেষ পৃষ্ঠায় ৮ কলাম নিয়ে ছাপা হয়।
বিক্ষুব্ধ নগরীর ভয়াল গর্জন
আমি শেখ মুজিব বলছি-
আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান গতকাল (মঙ্গলবার) এক বিবৃতিতে জনগণের উদ্দেশে বলেন, “সুশৃংখল ও শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল পালন এবং যাতে লুঠতরাজ ও অগ্নিসংযোগের মত অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে তৎপ্রতি কড়া নজর রাখার জন্য আমি জনগণের প্রতি আহ্বান জানাইতেছি।”
জনগণকে বিশেষ করিয়া ভাড়াটিয়া উস্কানিদাতাদের বিরুদ্ধে সজাগ থাকিতে হইবে। জনগণের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন “মনে রাখিতে হইবে, যেখানেই জন্মগ্রহণ করুক, যে ভাষাতেই কথা বলুক, বাংলার প্রতিটি বাসিন্দাই আমাদের দৃষ্টিতে বাঙ্গালী। তাদের জান-মাল-ইজ্জত আমাদের কাছে পবিত্র আমানত এবং উহা অবশ্যই রক্ষা করিতে হইবে।” জনগণের প্রতি আমার নির্দেশ : ৩রা মার্চ হইতে ৬ই মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৬টা হইতে দুপুর ২টা পর্যন্ত সমগ্র প্রদেশে হরতাল পালন করুন। সরকারী অফিসসমূহ সেক্রেটারীয়েট, হাইকোর্ট ও অন্যান্য কোর্ট-কাছারি, আধা সরকারী ও স্বায়ত্বশাসিত সংস্থা, পিআইএ, রেলওয়ে ও অন্যান্য পরিবহন মাধ্যম, যানবাহন, কল-কারখানা শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, হাটবাজারসহ সর্বত্র এই হরতাল পালন করিতে হইবে। শুধু এ্যাম্বুলেন্স (হাসপাতালের গাড়ী), সাংবাদিকদের গাড়ী, হাসপাতাল, ঔষধের দোকান, বিজলী ও পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে, হরতালের নির্দেশ প্রযোগ্য হইবে না।
ক্স আজ ৩রা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসার কথা ছিল। এই দিনটিকে ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসাবে পালন করিতে হইবে। এই উপলক্ষে আমি (শেখ মুজিব) পল্টন ময়দান হইতে ছাত্রলীগের জনসভার অব্যবহিত পরেই একটি গণমিছিলের নেতৃত্ব দান করিব।
ক্স রেডিও, টেলিভিশন বা সংবাদপত্রে আমাদের কর্মতৎপরতার বিবরণী বা আমাদের বিবৃতি প্রকাশ করিতে দেওয়া না হইলে এই সব প্রতিষ্ঠানের বাঙ্গালী কর্মচারীদের বাংলা দেশের ৭ কোটি মানুষের কণ্ঠরোধের প্রচেষ্টা নাকচ করিয়া দিতে হইবে।
ক্স আগামী ৭ই মার্চ বিকাল ২টায় রেসকোর্স ময়দানে আমি এক গণসমাবেশে ভাষণদান করিব। সেখানে আমি পরবর্তী নির্দেশ প্রদান করিব।
ক্স জনগণের প্রতি আমার আহ্বান সংগ্রাম সুশৃংখল ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে চালাইতে হইবে। উচ্ছৃংখলতা আমাদের আন্দোলনের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করিবে এবং গণবিরোধী শক্তি ও তাদের ভাড়াটিয়া দুষ্টদেরই স্বার্থোদ্ধার করিবে।
বাংলার কণ্ঠ স্তব্ধ করা যাইবে না ঃ শান্তি-শৃংখলার মধ্য দিয়া আন্দোলন চালাইয়া যান
জনগণের প্রতি প্রত্যয়-দৃঢ়-কণ্ঠ শেখ মুজিবের আহ্বান
আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান গতকাল (মঙ্গলবার) বিকালে এক বিবৃতিতে ঢাকায় নিরস্ত্র জনতার উপর গুলীবর্ষণের কঠোর নিন্দা করিয়া “শক্তির দ্বারা জনগণের মোকাবিলা করিতে ইচ্ছুক মহলকে হুশিয়ার করিয়া দিয়া বলেন, বাংলা দেশে আগুন জ্বালাইবেন না। যদি জ্বালান, সে দাবানল হইতে আপনারাও রেহাই পাইবেন না।” শেখ সাহেব আগামী ৭ই মার্চ পর্যন্ত আন্দোলনের কর্মসূচী ঘোষণা করিয়া দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন যে, ‘বাংলাদেশের জনগণের স্বাধিকার অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকিবে।”
তিনি আগামী ৬ই মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৮টা হইতে দুপুর দুইটা অবধি সমগ্র বাংলাদেশে হরতাল পালনের আহ্বান জানান। তৎপর আগামী ৭ই মার্চ বিকাল ২টায় শেখ সাহেব রেসকোর্স ময়দানে এক গণসমাবেশে ভাষণ দিবেন। ইহা ছাড়াও আওয়ামী লীগ-প্রধান আজকের দিনটিকে (বুধবার) ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসাবে পালনের ডাক দিয়াছেন। আজ বিকাল ৪টায় পল্টন ময়দান হইতে ছাত্রলীগের জনসভা শেষে তিনি একটি গণমিছিলের নেতৃত্ব দান করিবেন।
গণহত্যার শামিল
গতকল্য বিকালে প্রদত্ত বিবৃতিতে শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, গতকাল (মঙ্গলবার) নিরস্ত্র ছেলেদের উপর গুলীবর্ষণের ফলে অন্তত: ২ জন নিহত এবং অপর কয়েকজন গুরুতরভাবে আহত হইয়াছে। তিনি বলেন, শক্তিধরদের দ্বারা তাহাদের প্রতি চরম অবমাননার বিরুদ্ধে বাংলার অগণিত মানুষের সঙ্গে একাত্ম হইয়া প্রতিবাদ জ্ঞাপনের অপরাধেই তাহাদের গুলী করা হইয়াছে। তিনি বলেন আমি এই গুলীবর্ষণের কঠোর নিন্দা করি যারা শক্তির দ্বারা জনতার মোকাবিলা করিতে চান, তাদের এই স্বেচ্ছাচারিতা হইতে নিবৃত্ত হওয়ার আহ্বান জানাই। শেখ সাহেব বলেন, নিরস্ত্র জনতার উপর গুলীবর্ষণ গণহত্যারই শামিল এবং ইহা মানবতার বিরুদ্ধেই অপরাধ। সংশ্লিষ্ট মহলের উদ্দেশে তিনি বলেন, বাংলাদেশে আগুন জ্বালাইলে উহার লেলিহান শিখা তাহাদেরও রেহাই দিবে না।
জনগণের দুঃসহ অপমান
আওয়ামী লীগ প্রধান বলেন, ৭ কোটি বাঙ্গালীর নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসাবে শাসনতন্ত্রের প্রশ্নে জাতীয় পরিষদে পশ্চিম পাকিস্তানী সদস্যদের সঙ্গে বসিতে আমরা প্রস্তুত ছিলাম। ইতিমধ্যেই কিছুসংখ্যক পশ্চিম পাকিস্তানী গণপ্রতিনিধি ঢাকা আসিয়া পৌঁছিয়াছেন। কিন্তু অতঃপর এক অবাঞ্চিত ও আকস্মিক হস্তক্ষেপের দরুন পরিষদের অধিবেশন বসিতে পারিল না। তিনি বলেন, দেশেই অপরাধীদের কায়েমী স্বার্থবাদী ও আমলাতন্ত্রের স্বার্থের জিম্মাদার এক সংখ্যালঘিষ্ট গ্রুপের আপোষবিরোধী ভূমিকাই এই হস্তক্ষেপ ত্বরান্বিত করিয়াছে। তাহারা ঘোষণা করিয়াছে যে, তাহাদের শর্তানুযায়ী না হইলে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসিতে পারিবে না। শুধু তাই নয়Ñ যে সব পশ্চিম পাকিস্তানী সদস্য তাহাদের হুকুম মানিতে অস্বীকার করিয়াছে, তাহাদের শায়েস্তা করা হইবে বলিয়াও হুমকি দেওয়া হইয়াছে। শেখ সাহেব বলেন, এইভাবে এক অগণতান্ত্রিক মাইনরিটির আদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের প্রতিনিধিদের অধিকারের অস্বীকৃতি জ্ঞাপন জনগণের প্রতিই দুঃসহ অপমানস্বরূপ।
বাংলার মানুষ নতি স্বীকারে প্রস্তুত নয় বলিয়া-
আওয়ামী লীগ প্রধান বলেন, বাংলার জনগণ এই ধরনের হুকুম বা চাপের সামনে নতি স্বীকারে প্রস্তুত নয় বলিয়াই আজ শক্তির দ্বারা তাদের মেকাবিলা করার পথ বাঁচিয়া নেওয়া হইয়াছে। তিনি বলেন, ইহা সত্যই বেদনাদায়ক যে, যেইসব বিমান পশ্চিমাঞ্চল হইতে গণপ্রতিনিধিদের বহন করিয়া আনিতে পারিত, সেগুলিতে করিয়া এখন আনা হইতেছে সেনাবাহিনীর লোকজন আর সামরিক সরঞ্জাম।
পদানত করাই যদি উদ্দেশ্য হয় তবে-
শেখ সাহেব বলেন, ৭ কোটি বাঙ্গালীকে পদানত করাই যদি এইসব কার্যক্রমের উদ্দেশ্য হয়, তবে, গত দুইদিনে সমগ্র বাংলা দেশব্যাপী যে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ আন্দোলন হইয়াছে, উহাই বিশ্ববাসীকে দেখাইয়া দিয়াছে যে, বাঙ্গালীদের আর দাবাইয়া রাখা যাইবে না। বাংলার মানুষ স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসাবেই বাঁচিতে চায়। তাদের আর কলোনী বা বাজারের মত ব্যবহার করা যাইবে না।
পবিত্র দায়িত্ব: অসহযোগিতা
জনগণের দায়িত্ব ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বিবৃত্তিতে শেখ সাহেব বলেন, এই সংকট সন্ধিক্ষণে সরকারী কর্মচারীসহ সর্বস্তরের প্রতিটি বাঙ্গালীর পবিত্র কর্তব্য হইতেছে গণবিরোধী শক্তির সঙ্গে অসহযোগিতা করা এবং বাংলা দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করিয়া দেওয়ার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করা। তিনি বলেন, যেহেতু জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করিয়া দিয়াছে, তারাই আইনানুগ সকল ক্ষমতার একমাত্র উৎস। সকলকে এই কথা মনে রাখিতে হইবে।
সামরিক শাসন আর একদিনও নয়
আওয়াী লীগ প্রধান বলেন, এই পরিস্থিতিতে আর একদিনও সামরিক আইন বা মিলিটারী শাসন চালু রাখার কোন যৌক্তিকতা নাই। তাই আমি অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্যাহার, ‘মোকাবিলার’ অবসান এবং গণপ্রতিনিধিদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রয়োগের পথে সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণের আহ্বান জানাইতেছি। এই দাবী যতদিন পূরণ না হয়, যতদিন বাংলায় জনগণের স্বাধিকার অর্জিত না হয়, ততদিন আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকিবে।
‘বাংলার মাটিতে যেন স্থানীয়-অস্থানীয় বা সাম্পদ্রায়িক দাঙ্গা না হয়’
জনগণের প্রতি শেখ মুজিবের আহ্বান
আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার মাটিতে যাতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানাইয়াছেন।
গতকাল (মঙ্গলবার) ঢাকায় তাহার বাসভবনে সমাগত এক বিরাট জনতার উদ্দেশে ভাষণ দানকালে শেখ সাহেব বলেন, “সকলের প্রতি আকুল আহ্বানÑ বাংলার মাটিতে যেন বাঙ্গালী-অবাঙ্গালী, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা না বাঁধে। যদি এ ধরণের কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধেÑ আমি বুকে ব্যথা পাইব।” আওয়ামী লীগ প্রধানের বাসভবনে সমাগত এই জনতার মধ্যে মোহাম্মদপুর নিবাসী স্থানীয় ও অস্থানীয় উভয় সম্প্রদায়ের লোকই ছিল। তাহারা ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান তুলিয়া শ্লোগান সহকারে শেখ সাহেবের বাসভবনে আগমন করে। সেখানে তাহারা একযোগে ধ্বনি তোলে ‘আমরা সবাই আছি শেখ মুজিবের পিছে।’ জনতার উদ্দেশে প্রদত্ত সংক্ষিপ্ত ভাষণে শেখ সাহেব বলেন, “এখানে সবাই বাঙ্গালী। বাংলার মাটিতে বসবাসকারী বাঙ্গালী-অবাঙ্গালী হিন্দু-মুসলমান-খৃষ্টান-বৌদ্ধ সকলেই সমান।” সকলের প্রতি অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শরিক হওয়ার আহ্বান জানাইয়া শেখ মুজিব দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, “শহীদের রক্ত বৃথা যাইতে দেওয়া হইবে না। দাবী আমরা আদায় করিবই।”
ওইদিন আরো কয়েকটি প্রাসঙ্গিক সংবাদ ছাপা হয়-
আজ হরতালঃ পল্টনে জনসভা ও গণমিছিল
আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত রাখার প্রতিবাদে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আজ (বুধবার) সকাল ৬টা হইতে দুপুর ২টা পর্যন্ত ঢাকাসহ সমগ্র দেশে সর্বাত্মক হরতাল পালন করা হইবে। এ্যাম্বুলেন্স, সাংবাদিকদের গাড়ি, হাসপাতাল, ঔষধের দোকান, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বিভাগ অদ্যকার হরতালের বাহিরে থাকিবে।
আজ বিকাল ২টায় জাতীয় শ্রমিক লীগ ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের যৌথ উদ্যোগে পল্টন ময়দানে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হইবে। বিকাল ৪টায় পল্টন ময়দান হইতে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গণমিছিল বাহির হইবে।
দিনে ঢাকায় হরতালঃ
রাত্রির রাজধানীতে কারফিউ ভঙ্গঃ
৬ই পর্যন্ত সারা প্রদেশে হরতাল
জাতীয় পরিষদের অীধবেশন স্থগিত ঘোষণার প্রতিবাদে বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনের মহানায়ক আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সংগ্রামী বাংলার রাজধানী ঢাকা নগরী গতকল্য (মঙ্গলবার) প্রচন্ড গর্জনে ফাটিয়া পড়ে। সর্বাত্মক হরতাল কবলিত নগরী সারা দিন যেন মিছিল নগরীতে পর্যবসিত থাকে। দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের গণমানুষের এই নজিরবিহীন সার্বিক হরতালের দরুন রাজধানীতে গতকাল একদিকে চুড়ান্ত অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়, অপরদিকে ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের অবিস্মরণীয় দিনগুলির স্মৃতিকে ম্লান করিয়া দিয়া রাজপথে-জনপদে নামিয়া আসে আদিহীন-অন্তহীন জনতার স্রোত।
৫ দিনের মধ্যে অধিবেশন ডাকুন
করাচীতে সর্বদলীয় বৈঠক
অদ্য স্থানীয় আওয়ামী লীগ অফিসে দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি আলোচনার জন্য পিপল্স পার্টি বাদে বাকী সকল রাজনৈতিক দলের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে জনাব ভূট্টোর ভূমিকার সমালোচনা করিয়া আগামী ৫ দিনের মধ্যে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের দাবী জানান হয়। এই দাবীর পক্ষে আগামীকাল একটি শোভাযাত্রা বাহির করা হইবে।
সন্ধ্যা সাতটা হইতে সকাল ৭টা পর্যন্ত
ঢাকায় অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ
গতকাল এক ঘোষণায় বলা হয় যে, সামরিক শাসন কর্তৃপক্ষ ঢাকা পৌরসীমার মধ্যে ১০ ঘন্টাব্যাপী কারফিউ জারি করিয়াছেন। মঙ্গলবার রাত ৯টা হইতে অদ্য (বুধবার) সকাল ৭টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হইয়াছে। ঢাকার সহকারী সামরিক উপ-প্রশাসক লেঃ কর্নেল চৌধুরী মোজাফ্ফর আলীর এক নির্দেশে জানান হয় যে, আজ (বুধবার) হইতে অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা হইতে সকাল ৭টা পর্যন্ত কারফিউ পুর্জারি থাকিবে।
নূর খান বলেন
‘অধিবেশন বসিলে গ্রহণযোগ্য শাসনতন্ত্র রচনা সম্ভব হইত’
কাউন্সিল লীগ নেতা এয়ার মার্শাল (অবসরপ্রাপ্ত) নূর খান অবিলম্বে জাতীয় পরিষদের নয়া তারিখ ধার্য করার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের প্রতি আবেদন জানান। মার্চ মাসের মধ্যেই অধিবেশন অনুষ্ঠানের জন্য তিনি আহ্বান জানান।
তিনি লাহোরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন যে, জাতীয় পরিষদ স্থগিত করায় যে ক্ষতি হইয়া গেল তাহা অত্যন্ত ব্যাপক এবং অবিলম্বে অধিবেশন আহ্বান না করিলে এই ক্ষতি সংশোধনের অতীত হইয়া পড়িবে। জনাব নূর খান অভিমত প্রকাশ করেন যে, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসিলে গ্রহণযোগ্য শাসনতন্ত্র রচনা সম্ভব হইত।
লেখকঃ পরিচালক, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *