আমি তাঁর চোখে রাত দেখেছি, রাতে বদলে যাওয়া আলোর মাঝে নিজেকে হারিয়েছি বহুবার

প্রার্থিত আর পার্থিব জীবনের মাঝে প্রকৃতির পরশ বুলিয়ে দেয়া শিখেছিলাম প্রথম ” বাবলি ” পড়ে। সেই কবে স্কুলে পড়ি যখন। তারপর রাত আর দিনের আলো-ছায়া, বাতাসের গান জীবনের সাথে এক করে নেওয়ার অবাক করা ভালোবাসা শিখেছি তাঁর হাত ধরে। এতোটাই প্রভাবিত করেছিল আমাকে যে আমি তাঁকে চিনি শুধু লেখায়.. তাঁর ছবি ও ভালো করে দেখা হয়নি কখনো। আজ সারাদিন ভাবলাম, খুব কী কষ্ট হচ্ছে? না, অদ্ভুত শোনালেও সত্যি এটাই। আমার কাছে তার লেখা রইলো মানে আমি তাঁকে ধারণ করতে পারছি। আমার সব স্বচ্ছতা জুড়ে মেঘের ডানায় প্রাণের স্পন্দন হয়ে আলোড়িত তিনি। আমার ” মাধুকরী ” আমার মনে আন্দোলিত। “মানুষের নিজের হাতে -গড়া প্রতিটি জিনিস ই থাকে, শুধু মানুষ ই থাকে না। এই বিপুল রঙ্গমঞ্চে তার ভূমিকাটিই সংক্ষিপ্ততম। মানুষের সৌন্দর্য ত৷ শুধু মুখ, চোখ বুকে হয় না, মনের আলোয় আভাসিত না হলে সৌন্দর্য বীজের মতোই সুপ্ত থাকে, ফুল হয়ে ফুটে ওঠে না।”
তাঁর কথাতেই তাঁর স্তুুতি হলো। আবারও মাধুকরী!!! প্রথম পড়েছিলাম ২১/২২ বছরে। জীবনের অন্য মানে বুঝার বয়স হয়নি তখন। আবার যখন পড়লাম তখন জীবনের শেষ বেলা। একটা বই মানুষকে কোথায় টেনে নিয়ে যায় আমার অজানা ছিল । শেষ করে কান্না পাচ্ছে। মনে হচ্ছে খুব পছন্দের সুগন্ধির কৌটটা শেষ হয়ে গেল। বইয়ের উৎসর্গে লিখা ” একবিংশ শতাব্দীর নারী ও পুরুষের জন্যে “। অথচ প্রথম ছাপা হয়েছে ১৯৮৬। তাহলে বুদ্ধদেব এ-ই বই লিখেছেন আরো আগে! কতোটা অগ্রসর লেখক হলে এটা সম্ভব? আমার পক্ষে সম্ভব হলে, যারা বইকে শুধু রিডিং পড়ে তাদের নয়, যারা বইকে ধারণ করে নিজের ভিতর, তাদের সবাইকে একটা করে পড়তে দিতাম। না, ১৯/২০ এর প্রেমের জন্য নয়। একটা মানুষের বোধের জায়গা টুকু তৈরি হয় ৩৫/৪০ এ। অবশ্য অনেকের সারা জীবন ও লাগে! তবে বোধসম্পন্ন মানুষের বোধদয় ৩৬/৪০ এ পরিপূর্ণতা পায়। মানুষের জীবনে ঘটা কোন ঘটনাই নতুন নয়। শুধু কে, কীভাবে সেটা লালন করবে তাই নতুন । আমি মনে হয় দীর্ঘ দিন এ-ই ঘোরে ঘুরাঘুরি করবো। নিজের পড়া পুরনো বই নিজের জীবন কে ছাপিয়ে উপচে পড়বে ভাবিনি! এটা মুগ্ধতা নয়, এটা অবাক হওয়া নয়, এ অনুভব আমার চেনা নয়। বিশাল একটা আকাশে নিজেকে এক ফালি আলোকোজ্জ্বল মেঘ মনে হচ্ছে। যার ভিতরে রংধনু জায়গা করে নিতে পারে। উন্মুক্ত মাঠে হুহু হাওয়ার সাথে একা দাড়িয়ে বাতাসের সবটুকু সুবাস টেনে নেওয়ার মতো। জীবনের অভিনব রুপ দুহাতের মুঠোয় আবদ্ধ করে জোনাকির মতো জ্বলে উঠা। স্নিগ্ধতার স্বরূপ অন্বেষণে আদিম অধিবাসীদের মতো ধীরস্থির এক জগৎ এ ডুবে যাওয়া। কৃতজ্ঞতা জীবনের প্রতিটি স্তররের নানা সময়কে। ভালোবাসায় ডুবে থাকবো অনেক দিন ” মাধুকরী ” তোমাতে…
সবিনয় নিবেদন , কোজাগরী, ” একটু উষ্ণতার জন্য ” চানঘরের গান, সুখের কাছে, হলুদ বসন্ত, আরো আরো লিখা, সব রয়ে গেছে। আমার মতো হাজারো মানুষের মধ্যে একজন বা কয়েকজন পৃথু, রুষা, কুর্চি, ভুচু জেগে উঠবে সময়ের আলোয় তাঁর লেখার মাধ্যমে। নিজেকে খুঁজে পাবার এ-তো গভীর আবেদন আর কোথায় আছে? মানুষের ভিতর জমে থাকা হাজারো অনুভব এমনি করে কে আর তুলে আনতে পারে? প্রকৃতির নানা রুপ, সুবাস আর বেঁচে উঠার নতুন ছন্দ আমাকে নিয়ে গেছে আলাদা ভুবনে। আমি চোখ বন্ধ করে হেঁটেছি ‘ বানাজার’ নদীর রাতমোহনায়, আমাকে মান্দালায় নিয়ে গিয়েছেন হালোর কালো জলে পা ভিজাতে। আমি তাঁর চোখে রাত দেখেছি, রাতে বদলে যাওয়া আলোর মাঝে নিজেকে হারিয়েছি বহুবার। বুদ্ধ দেব গুহরা বেঁচে থাকে এভাবেই বদলে যাওয়া আমার মতো হাজারো পাঠকের জীবনের আলোড়ন হয়ে।
-লেখক পরিচিতি ঃ সিনিয়র শিক্ষক

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *