প্রতিদিনই হোক নারী দিবস, প্রতিদিনই হোক পুরুষ দিবস

বেনজীর চৌধুরী ::
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ইতিহাস রচনা করেছেন নারী শ্রমিকরা। প্রায় ২ শত বছর আগে শিল্প বিপ্লবের পর নারীরা শ্রমিক হিসাবে কাজে যোগ দিতে শুরু করেন। শ্রমিক হিসাবে নারীরা ছিল ভীষণ অমানবিক আচরনের শিকার। স্বল্প মজুরী, সস্তা শ্রমিক দিয়ে নির্ধারিত ছিল না শ্রম ঘন্টাও। অথচ মজুরী ছিল পুরুষদের অর্ধেক। কিন্তু‘ জীবন ধারনের জন্য শ্রম বিক্রি ছাড়া নারীদের আর কোন উপায়ও ছিল না। ১৮৫৭ সালের ৮ইং মার্চ নিউইয়র্ক সেলাই কারখানায় নারী শ্রমিকরা উপযুক্ত বেতন উন্নত কর্ম পরিবেশ ও ১০ ঘন্টা কর্ম দিবসের প্রতিবাদে আন্দোলনে নামে। সেদিন হাজার হাজার নারী শ্রমিকদের মিছিলে গুলি চালায় পুলিশ। নারী আন্দোলনের ইতিহাসে এটি ছিল প্রথম গুলি চালানোর ঘটনা। এর তিন বছর পর ১৮৬০ সালে সুঁই কারখানায় নারী শ্রমিকরা তাদের নিজস্ব ইউনিয়ন ঘঠন করে। একদিকে নারী আন্দোলন অন্যদিকে শ্রমিক আন্দোলন দাঁনা বাধতে থাকে। সে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৮৮৬ সালের ১লা মে জন্ম নেয় বিশ্ব শ্রমিক দিবসের ইতিহাস। অন্যদিকে ১৮৮১ থেকে ১৯৮৯ সালে ইংল্যান্ডে ম্যাচ ফ্যাক্টরীর নারী শ্রমিকরা আন্দোলন শুরু করে। ম্যাচ ফ্যাক্টরীরর নারী শ্রমিকদের সাথে যোগ দেয় সিগারেট, বিস্কুট, কম্বল, পাট, জ্যাম ও আচার ফ্যাক্টরীর শ্রমিকরাও। ১৯৮৯ সালের মহামতি ফ্রেডরিথ এঙ্গেলসের উদ্যোগে প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলন। ১৯০৭ সালে ষ্ট্রটগার্ডে প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯০৯ সালে ২৮শে ফেব্রুয়ারী আমেরিকাবাসি জাতীয় নারী দিবস পালনের ঘোষনা দিয়েছিল। ১৯১০ সালের আগষ্ট মাসে কোপেনহেগেনে সমাজতন্ত্রীদের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে সমাজতন্ত্রী নেত্রী ক্লারা জেটকিন ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের প্রস্তাব দেন।
মানব চক্রের যেই মাধ্যম আমাদের এই পৃথিবীতে আসার তার একটি অপার মাধ্যম এই নারী। সকল ধর্মেও আছে নারীর সম্মানের স্থান। নিজেকে অন্যের সুখে হাসতে হাসতে বিলিয়ে দিতে পিছনে হাটেন না এই নারী।
আজ আমি শুরু করবো বর্তমান যুগের অস্থিতিশীল পরিবেশের ঘটনা নিয়ে। আমাদের সমাজের যে কত দূরহ অবস্থা যা ভেবে আমার গা শিহরিয়ে উঠে। বর্তমান যুগে আমরা নারী জাতি কিছু কিছু ক্ষেত্রে বড় অসহায় হয়ে পড়েছি। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমি যে একজন নারী হয়ে কিছু নিকৃষ্ট ঘটনার জন্য লজ্জিত বোধ করছি। আমাদের বর্তমান সমাজে কিছু নারী সমাজের চোখে নিজেকে অনেক সুখী ভেবে হাসি মুখে জীবন যাপন করে দেখাচ্ছে, অথচ তারা অপরদিকে সে যে কত অসহায় এবং একাকী, তা কাউকে সে বুঝতে দিতে চায় না শুধু মাত্র সামাজিকতার ও সন্তানের কারনে। কিন্তু‘ এই নারীরা যে দিনে দিনে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে তাহা কেউ বুঝে না। সেই নারী কারো বোন, কারো মেয়ে, কারো স্ত্রী এবং করো মা। বর্তমান আমাদের এই বাংলাদেশে আমি দেখেছি আমাদের কিছু উশৃঙ্খল নারীর জন্য আমাদের গোটা নারী জাতি মানসিক যন্ত্রনায় কাটাচ্ছে। পুরুষরা তাদের টাকা পয়সার জন্য সমাজে কেমন যেন অসুস্থ’ অসহনীয় প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে পড়ছে। আমাদেরকে এই ব্যাপারে রুখে দাঁড়াতে হবে। তা না হলে আমাদের শিশুরা কি শিক্ষা নিয়ে আমাদের থেকে ওরা ওতে ছোটবেলা থেকে যদি দেখে তার বাবা মাকে সম্মান দিচ্ছে না এবং মা ও বাবাকে সম্মান দিচ্ছে না তখনই তারা মানষিক ভাবে ধিরে ধিরে বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। তখন গোটা জাতি সম্মানের দিকে কিভাবে আগাবে। বর্তমান যুগে ডিভোর্সের সংখ্য এত বেশি হয়ে পড়ছে যে অন্যেকে এখন বিয়ে করতে ও ভয় পায় আবার কেউ কেউ বিয়েটাকে বিজনেস কেউ আবার ফ্যাশন হিসেবে বেছে নিয়েছে, কেমন যেন ভালোবাসা বলতে কিছুই নেই মানুষের মধ্যে। যার জন্য ধিরে ধিরে সবাই একে অপরের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। আমাদের সবাইকে এখন অন্যায় এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। তাহা না হলে সবার কেমন যেন চক্ষু লজ্জা বলতে কিছুই থাকছে না। এতে জাতি তার পারিবারিক দিক থেকে দায়িত্ববোধ বলতে যে পুরুষের তার সংসারের এবং নারীদেরও যে সংসারের এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ব্ আছে তাই থেকে তারা দূরে সরে যাচ্ছে। সবারই সবার প্রতি দায়িত্ববোধ থাকা উচিত, তাহলেই না আমরা সুন্দরভাবে একটা জাতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত লাভ করতে পারব। ভালো মনুষ হিসাবে আমাদের সন্তানদেরকেও গড়তে পারবো এবং নারী জাতির প্রতি আমাদের সম্মান দেখাতে হবে আমাদের সৃষ্টি কর্তা আল্লাহ সোবহান ও তায়ালা ও তার পবিত্র কোরআন শরীফে বলেছেন মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেস্ত। তিনি সমগ্র নারী জাতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছেন। আজ আমাদের বাংলাদেশে সব জায়গাতেই নারী এগিয়ে আছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী একজন সফল প্রধানমন্ত্রী । গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে বেশির ভাগ নারী আর্মি, নেভি, বিমানবাহিনী, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী সব জায়গাতেই নারী জাতি কাজ করছে আবার তারা নিজের বাসাতে ও ঘর সংসার সামলাচ্ছে। একটা পুরুষের কিন্তু‘ বাহির থেকে কাজ করে আসার পর সে ঘরে ফিরে আরাম করে। কিন্তু‘ একজন নারী সারাদিন যদি বাহিরেও কাজ করে তারপর সে ঘরেল ফিরে তার সন্তান কি খাবে কি পড়বে, স্বামী কি খেতে পছন্দ করে সেদিকে তার সব সামলাতে হবে। আবার ঘুম থকে যখন উঠে সে অফিসে যাবে তখন তাকে সারাদিনের সব কিছু সংসারের গুছায়ে তারপর তাকে অফিসে যেতে হয়। সুতরাং আসুন আমরা সবাই একটু ভেবে চিন্তে আমাদের মা, বোন, কন্যা সন্তান সবার প্রতি অবহেলিত না ভেবে সম্মান প্রদর্শন করি। তাহলেই আমরা জাতিগত ভাবে উন্নতি সাধন এবং একটা সুশিক্ষিত’ জাতি গড়তে পারব। পৃথিবীর বুকে আলেকজান্ডার বলেছেন, আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও আমি একটি শিক্ষিত জাতি দিব। বাসে ট্রেনে রিজার্ভ সিটের লড়াই নয়, লড়াইটা বাড়ি থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে। কর্মক্ষেত্র থেকে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে নারীর যোগ্যতা অনুযায়ী সম অধিকার পাওয়ার। এটা ঠিক ফেমিলি জমের আড়ালে ক্ষেত্র বিশেষে নিজের স্বার্থ, চরিতার্থ করার চেষ্টা অনেকেই করেন। কিন্তু‘ সততা সবার মানুষিকতার প্রকাশ পায় না। একদিন নারী দিবস পালন করে কিছুই পরিবর্তন বদলানো যায় না বরং যাদের দৌলতে শুরু হয়েছে সমান অধিকারের লড়াই, যদি সমান হয়েই থাকি তবে একটি বিশেষ দিন কেন? প্রতিদিনই হোক নারী দিবস, প্রতিদিনই হোক পুরুষ দিবস।
বিচার হোক যোগ্যতায়।
লেখক পরিচিতি : গৃহিণী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরীর পুত্রবধূ।

 

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.