মানবাধিকার রক্ষায় অগ্রনী ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ

আজ ১০ ই ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস
: এডভোকেট জেসমিন সুলতানা :
৭২ বছর আগে মানবাধিকার বাস্তবায়নের আন্দোলনের ফসল আজকের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস।
আমাদের করতে হচ্ছে সমতার লড়াই,শান্তি প্রতিষ্ঠার লড়াই,মর্যাদার লড়াই,সমান আইনি সুবিধা পাওয়ার লড়াই,স্বাধীন বিচার ব্যবস্হার লড়াই, স্বাধীন ভাবে চলার লড়াই, সর্বোপরি মানবাধিকার বাস্তবায়নের লড়াই।
” ভূমিহীন বলে মেধা তালিকায় স্হান পাওয়া আসফিয়ার চাকুরী পাওয়ার লড়াই”
সারা বিশ্ব আজ দিবস টি অনাড়ম্বর পরিবেশে বিভিন্ন সেমিনার,সিম্পোজিয়াম,রেলী ব্যনার ফেষ্টুন টানিয়ে পালন করছে ।।মনে করিয়ে দেয়া আমি মানুষ, আমার আছে অন্ন,বস্র, বাসস্থান,চিকিৎসা,শিক্ষা পাওয়ার অধিকার। আন্তজার্তিক মানবাধিকার সনদ,আমাদের পবিত্র সংবিধান আমাকে এ অধিকার দিয়েছে যা ভোগ করার সু্যোগ দিতে হবে।।
আমার সোনার বাংলাদেশ মানবাধিকার রক্ষায় অগ্রনী ভূমিকা পালন করছে। ১২ লক্ষ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে মানবতার মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাইতো তিনি মানবতার মা।
মূলতঃ নারীর অধিকার হলো মানবাধিকার। তাই সার্বজনীন ঘোষনা পত্রে প্রদত্ত অধিকার নারীকেই আদায় করতে হবে।
ফ্রান্সের বিখ্যাত লেখিকা শিমনদ্যা ব্যভোরিয়ার এর বিখ্যাত উক্তি”” One is not born,but rather becomes,a woman”
“নারী হয়ে কেউ জন্মায় না,নারী হয়ে উঠে”
সত্যিই পুরুষ শাষিত এই সমাজ ব্যবস্হায়,সামাজিক পরিবেশ,রাজনীতি, সমাজনীতি, ধর্মীয় আচার,দর্শন, সংস্কৃতি বিভিন্ন প্রথা সব কিছুতেই নারীকে একটি গন্ডির মধ্যে একটা বৃত্তের ছকে কে বড় করে তোলা হয়।। যত আধুনিক মনোভাবাপন্ন পরিবার ই হোক না কেন মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া হয় তুমি মেয়ে তোমাকে চলতে হবে নির্দিষ্ট নিয়মের বলয়ে।
সৃষ্টির লগ্ন থেকেই অত্যাচার,অবিচার,নির্যাতন আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজকাঠামোর দানবরূপী পুরুষ দের নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছিল নারী।
পরবর্তী কে মানবাধিকার বিষয়ে মানুষের উপলব্ধির ফসল
“সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষনা পত্র” ১৯৪৮ সনের ১০ই ডিসেম্বর প্যরিসে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারন পরিষদে এই ঘোষনা দেয়া হয়।। এ ঘোষনা পত্রের ১- ৩০ ধারায় মানুষের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ তথা নারী অধিকার সম্পর্কে বলা হয়েছে।
ধারা ১. সমস্ত মানুষ স্বাধীন ভাবে সমান মর্যাদা এবং অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহন করে,তাদের বিবেক বুদ্বি ও এক সুতরাং সকলেই একে অপরের প্রতি ভাতৃত্ব সুলভ মনোভাব নিয়ে আচরন করা উচিত।
৩. জীবন,স্বাধীনতায়এবং দৈহিক নিরাপত্তায় প্রত্যেকের সমান অধিকার।
ধারা ৫. কাউকে নির্যাতন করা যাবেনা,কারো প্রতি নিষ্ঠুর আচরন করা যাবেনা,কাউকে এহেন শাস্তি দপয়া যাবেনা।
ধারা ৬. আইনের সামনে প্রত্যেকের ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি লাভের অধিকার রয়েছে। ৩০ টি ধারা সম্বলিত এ ঘোষনা পত্র মানব জাতির জন্য মাইল ফলক।
মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে ১৯৭২ সনে নব গঠিত হয়গনপ্রজাতন্ত্রী স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য রচিত হয় পবিত্র সংবিধান।।এ সংবিধানে নারীর মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭ এ বলা হয়েছে
” সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী”
অনুচ্ছেদ ২৮ (১ ) ” কেবল ধর্ম,গোষ্ঠী,, বর্ন, নারী পুরুষ ভেদে বা জন্মস্হানের কারনে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য করবেনা”
এ ছাড়া সংবিধানের ২৮ (৩), ২৮ (৪),২৯(১) ধারায় নারী অধিকার সম্পর্কে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের লিখিত সংবিধানে নারী অধিকার সমূহ সুস্পষ্টভাবে সংরক্ষিত থাকা সত্বেও যখন তা অবমানিত হয়ে আসছিল এবং পৃথিবী ব্যাপি নারীর প্রতি সংহিসতার মাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাচ্ছিল তখনই ১৯৭৯ সনের ১৮ ই ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারন পরিষদে গৃহিত হয়েছিল
” নারীর প্রতি সর্বপ্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ ” সিডো”
যদিও ১৯৮১ সনে সিডো সনদ কার্যকর হয়। বাংলাদেশ দুটো ধারা ব্যতীত অন্যান্য ধারা গুলোকে মেনে নিয়ে ১৯৮৪ সনে সিডো সনদে অনুস্বাক্ষর করে।।
সি ডো সনদের ১- ১৬ টি ধারায় নারীর অন্ন,বস্ত্র,বাসস্হান,শিক্ষা,চিকিৎসা সহ সামাজিক,রাজনৈতিক পারিবারিক,সাংস্কৃতিক সমস্ত কর্মকান্ডে নারী অধিকার কে নিশ্চিত করা হয়।।
মালালা ইউসুফযাই যদি অনেক পরে বলেছিল”
I raise up my voice– not i can sout,but so that those without a voice can be heard….. We cannot succeed what half of us are held back

মালালার বক্তব্যের অনেক পূর্বের বিশ্বের নারী প্রতিনিধিরা একত্র হয়ে একই স্বরে একই সুরে কথা বলার জন্য একত্রিত হয়ে ছিল চীনের বেইজিং এ
১৯৯৫ সালে বিশ্বের১৮৯ দেশের নারীরা পালন করে চতুর্থ নারী সম্মেলন।অত্যন্ত সুন্দর ও সুচারুভাবে আগামীদিনের কর্মপরিকল্পনা হিসেবে বেইজিং ঘোষনা দেয়া হয়।।
সরকারী,বেসরকারী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্হা, এন,জি,ও গুলো নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার নতুন রুপ নিয়ে সম্মিলিত ভাবে এগুতে থাকে। এ সম্মেলনে নারী পুরুষের সমতা বিধান,বৈষম্য বিলোপ, ও অগ্রগতির স্বার্থে ১২ টি ক্ষেত্র চিন্হিত করা হয়।
নারী ও দারিদ্র,নারী শিক্ষা ও নারী প্রশিক্ষণ, নারী ও স্বাস্থ্য, নারী নির্যাতন,নারী ও সশস্ত্র সংঘাত,নারীও অর্থনীতি,,ক্ষমতা ও সিদ্বান্তগ্রহনে নারী,নারী ও অর্থনীতি,
ক্ষমতা ও সিদ্বান্ত গ্রহনে নারী,নারীর অগ্রগতির জন্য প্রতিষ্ঠানিক ম্যাকানিজম,নারীর মানবাধিকার,নারী ও গনমাধ্যম,নারী ও পরিবেশ এবং মেয়েশিশু,নারীর লাঞ্চিত ও নির্যাতিত হওয়ার চিত্র ১২ টি দিকের মাধ্যমে উজ্জল হয়ে উঠেছে।।
” Women are the real architect of society”
বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার নারীর ক্ষমতায়ন প্রক্রিয়ায় দ্রুত এগিয়ে চলেছে, বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নারী,মাননীয় স্পিকার নারী,সর্বোচ্চ আদালতের বিচার পতি হিসাবে রয়েছেন নারী,বিরোধী দলীয় নেত্রী নারী,বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইসচ্যান্সেলর হিসেবে রয়েছেন নারী,ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছেন নারী,সাংবাদিকতায় শীর্ষস্থানীয় পদে আছেন নারী, সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ে,প্রশাসনে, পুলিশ প্রশাসনে চিকিৎসকের পেশায়,আইনজীবী হিসেবে ,গার্মেন্টস জগতে, অভিনয়ে, শিল্পকলায় সর্বত্রই বিরাজমান নারী।।
, সেই নারী এতো কিছুতে থাকার পরও যখন শারীরিক, মানসিক,দৈহিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছিল তখন বর্তমান গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ২০১১ সনে ঘোষনা করেছিল নারী উন্নয়ন নীতি মালা।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক বিশাল জন গোষ্ঠী নারী,তাই নারী উন্নয়নে ও নারীর ক্ষমতায়নে প্রনয়ন করা হয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা।
নারী তার অধিকার অধিকার আদায়ে সংগ্রামী হলেও বাস্তবায়ন,আদায় কতটুকু করতে পারছে নারীরা।পরিবারে,শিক্ষা প্রতিষঠানে,কর্মস্হলে,যাতায়ত পথে নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।যৌতুকের বলী হচ্ছে হাজারো নারী। নারী ও নির্যাতন ও যৌতুক প্রতিরোধে হয়েছে আইন।। আইন আছে কিন্তু তার সঠিক বাস্তবায়ন এর অভাবেই বেড়ে চলেছে নির্যাতনের মাত্রা।।
রাস্তা ঘাটা, সরকারী,বেসরকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাদ্রাসা সমূহে যেন মহোৎসবে মেতে উঠেছে যৌন নিপীড়নের।এ থেকে পরিত্রান হয়তো পুরোপুরিভাবে পাওয়া যাবেনা যতদিন ব্যক্তি মানসিকতার পরিবর্তন নাহবে।।
বাংলাদেশের মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের বর্তমান প্রধান বিচার পতি জনাব সৈয়দ মাহমুূদ হোসেন ও বিচার পতি জনাব কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী মহোদয়ের বেন্চ “যৌন নিপীড়ন” রোধ কল্পে দিক নির্দেশনা মুলক কালজয়ী রায় প্রদান করেছেন যা প্রতিপক্ষ মন্ত্রনালয় পালনে এবং নির্দেশনা মতে প্রতিপালনে বাধ্য।
২০১০ সনে দেয়া রায় অতিসত্বর বাস্তবায়নের মাধ্যমেই বাড়বেনা আর নারীর প্রতি সহিংসতা ও পাশবিক নির্যাতন।।
এ ছাড়া আমাদের তথা কথিত লেবাসধারী মৌলভী সাহেবগন উগ্র ধর্মীয় মতবাদ প্রচারে লিপ্ত না হয়ে ওয়াজ মাহফিলে,প্রতিশুক্রবারের বয়ানে নারী নির্যাতন কারীদের কি শাস্তির ব্যবস্হা রয়েছে তা তুলে ধরার মাধ্যমেই প্রশমিত হতে পারে নির্যাতনের মাত্রা।
তবে ঢালাও ভাবে পুরুষদের দোষারোপ করা যাবেনা, কৃতজ্ঞতা তাদের প্রতি যারাঁ নারীদের হাত হাত মিলিয়ে অনুপ্রেরনা দিচ্ছেন,শক্তি প্রদান করছেন, ঘৃনা করছি মানুষরূপী কুকুর দের।
যারা বিষবাষ্প ছড়িয়ে সমাজকে করে কলুষিত।
নারী পুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় পরিপূরক হোক, আশা ও বিশ্বাস সমতার ভিত্তিতে নারী পুরুষের ব্যপক অংশ গ্রহনের মাধ্যমে ই আমরা গড়ে তুলতে পারবো মাদকমুক্ত,সন্ত্রাস মুক্ত,নারী নির্যাতন মুক্ত ক্যাসিনো মুক্ত,নারীবান্ধব একটি সুন্দর ঝলমলে বাংলাদেশ।
মানবাধিকার রক্ষায় সবাই আজ আসফিয়ার পাশে দাঁড়াই। স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে বাংলা মায়ের সন্তান আসিয়া ভূমিহীন বলে চাকুরীর পাওয়ার অধিকার হারাতে পারেনা। আজকের দিনের প্রত্যয় হোক স্পর্শকাতর বিষয়টি মানবতার জননী আমাদের মাননীয় প্রধানমত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি গোচর হবে তিনি আসফিয়ার মানবাধিকার রক্ষা করবেন।এটাই হোক আজকের দিবসের মূল দাবী।।
মানবাধিকার রক্ষা ও বাস্তবায়নে সবাই প্রতিজ্ঞা বদ্ধ হই।
জেসমিন সুলতানা
এডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট

সভাপতি ( ভারপ্রাপ্ত)
সাউথ এশিয়ান লইয়ারস ফোরাম।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.