মা ইলিশ রক্ষায় কঠোর অবস্থানে টাস্কফোর্স : ধরা পড়লে জেল-জরিমানা

ইব্রাহীম রনি :
প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় আগামী ৪ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের সব নদ-নদী, সাগর মোহনাসহ প্রজনন ও অভয়াশ্রমে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। এ ছাড়া এই সময়ে ইলিশ ক্রয়-বিক্রয়, পরিবহন ও মজুত নিষিদ্ধ। ইলিশের বাড়িখ্যাত চাঁদপুরে অভয়াশ্রম বাস্তবায়নে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে টাস্কফোর্স।
মৎস্যজীবীদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে সমাবেশ, নদীতে ২৪ ঘণ্টা অভিযান পরিচালনাসহ ব্যাপক পরিকল্পনা করছে জেলা প্রশাসন, পুলিশ, নৌ পুলিশ কোস্টগার্ড ও মৎস্য বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত টাস্কফোর্স। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ নদীতে মাছ শিকার করতে গিয়ে ধরা পড়লে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এক থেকে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।
মা ইলিশ রক্ষায় গত ২৯ সেপ্টেম্বর প্রস্তুতি সভাও হয়েছে। এতে বক্তারা বলেন, মা ইলিশের জন্য ক্ষতিকর অবৈধ বালু উত্তোলনের ড্রেজার। অভয়াশ্রম চলাকালে এই অবৈধ ড্রেজার বন্ধ রাখতে হবে। ব্যক্তি মালিকানাধীন স্পিডবোট বন্ধ রাখতে হবে। কারণ, এগুলো দিয়ে মা ইলিশ পাচার করা হয়। রাজরাজেশ্বর, বোরো চর, বড়স্টেশন টিলাবাড়িতে প্রতি ঘরে ঘরে ইলিশ মজুত করা হয়। এ ছাড়া শহরের টিলাবাড়ি, রনাগোয়াল, রামদাসদী ও বহরিয়া এলাকার মা ইলিশ বিক্রির মৌসুমি হাট বন্ধ করতে হবে। মৌসুমি আড়তদার ও দাদনদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কারেন্ট জাল উৎপাদন বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
চাঁদপুর কোস্টগার্ডের স্টেশন কমান্ডার সাব লেফট্যানেন্ট রোহান মঞ্জুর বলেন, মা ইলিশ রক্ষায় আমরা জোরালো অভিযান পরিচালনা করবো। ইতোমধ্যে সদরদফতরের সঙ্গে কথা বলেছি। পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, চাঁদপুর স্টেশন ছাড়াও হাইমচরে একটি আউটপোস্ট আছে। আরও একটি আউটপোস্ট করার পরিকল্পনা রয়েছে। রাত-দিন দুই শিফট অথবা তিন শিফটে আমরা নদীতে অভিযান পরিচালনা করবো। মা ইলিশ রক্ষায় যা যা করা সম্ভব তার সব প্রস্তুতিই নিচ্ছি।
টাস্কফোর্সের অন্যতম সদস্য নৌ পুলিশ চাঁদপুর অঞ্চলের সুপার কামরুল ইসলাম বলেন, মা ইলিশ রক্ষায় নৌপুলিশ একাই চেষ্টা করবে, এমন প্ল্যান নিয়ে এগুচ্ছি। ইতোমধ্যে আমরা ফাঁড়ির আইসিদের নিয়ে সভা করেছি। আমাদের সদরদফতর থেকে সব ধরনের অতিরিক্ত লজিস্টিক সাপোর্ট দেবে।
তিনি বলেন, জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত প্রতিটি এলাকায় এওয়ারনেস প্রোগ্রাম করবো। ৪ অক্টোবর থেকে নদীতে সাঁড়াশি অভিযান চলবে। প্রত্যেক ফাঁড়ি থেকে নদীতে আমাদের ২৪ ঘণ্টা ডিউটি থাকবে। প্রতিদিন ফাঁড়ির অধীনে সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা এবং এরপর থেকে সকাল পর্যন্ত আরেকটা টিম নদীতে কাজ করবে। কিছু কিছু ফাঁড়ি থেকে সবসময় দুটি করে টিম থাকবে। আর যেসব এলাকা একটু ছোট সেখান থেকে একটি টিম কাজ করবে। প্রয়োজনে আমরা কোস্টগার্ডসহ সবার সহযোগিতা নেবো। এ ছাড়া এসব অভিযানে জেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সবাই থাকবে।
চাঁদপুর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুদীপ্ত রায় বলেন, নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ করতে হবে। অবৈধভাবে যেসব ড্রেজার বালু কাটে, সেগুলো বন্ধ করতে হবে। অভিযান চলাকালে মৌসুমি জেলের পাশাপাশি মৌসুমি আড়তদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তারা অসহায় জেলেদের নদীতে নামিয়ে সুবিধা নেয়। পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে হবে।
টাস্কফোর্সের সভাপতি জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ বলেন, মা ইলিশ রক্ষায় এবারও আমরা কঠোর থাকবো। যেকোনও মূল্যে এই অভিযান সফল করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে নদী পাড়ের জেলে, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মানুষকে তৎপর থাকতে হবে। আমরা চাইবো না গরিব জেলেদের আটক করতে। কিন্তু তারা কথা না শুনলে আমরা কঠোর হতে বাধ্য হবো। এই সময়ে কেউ মাছ শিকার করতে গিয়ে ধরা পড়লে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এক থেকে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, অভিযান চলাকালে একটি নৌকাও নদীতে নামতে পারবে না। অধিক গতি বা একের অধিক ইঞ্জিনচালিত নৌকাগুলো রিকজিশন করে রাখা হবে। সেগুলো নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড ও জেলা পুলিশ ব্যবহার করবে। আর এ বছর আটক নৌকা সঙ্গে সঙ্গে নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হবে। হাইমচরে ২২ দিন যাতে কোস্টগার্ডের একটি জাহাজ স্থায়ীভাবে থাকে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। অভয়াশ্রমের ২২ দিন ড্রেজার বন্ধ থাকবে। নদীতে ব্যক্তি মালিকানাধীন স্পিডবোট বন্ধ থাকবে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *