যেখানে আলোরা আসে সবুজের ঝাঁপিতে, তাকে ছুঁয়ে দেন শিক্ষার কারিগররা

সাঈদা আক্তার :

প্রাপ্তি এবং প্রত্যাশা এ দুটো শব্দ যখন একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠে তখন তা সীমানা ছাড়িয়ে অসীমে স্থান করে নেয়। প্রকৃতি নিজেই নিজের জন্য অনন্য। তারপরও একজন মানুষ অনন্যকে যখন যত্নে, ভালোবাসায় আগলে রাখে, তখন তা নিজেকে বিকশিত করে প্রথমাদের মতোই। সে প্রকৃতির মতো সবুজ, সচেতন মানুষটি রতন কুমার মজুমদার। আর প্রতিষ্ঠানটি “পুরান বাজার ডিগ্রী কলেজ “। খুব কাছের একটি জায়গা। যাওয়া হয়নি নানা কারণে। যা হয় আর কী! “দেখা হয়নি চক্ষু মেলিয়ার মতো…কতোটা অন্য রকম হতে পারে একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান! তার সবটুকু আপনাকে চোখের পলকে মনের গহীনে উঁকি দিয়ে বুঝিয়ে দেবে। প্রতিষ্ঠান শুধু প্রতিষ্ঠান থেকে যায়, যদি তাতে ভালোবাসা রঙ না লাগে। যদি তাতে অন্তরের নির্যাস না মেশে। বিশাল গেট পেরিয়ে ঢুকতেই সামনে এসে দাড়াবে রণসংগীত আর জাতীয় সংগীত তথা বাংলা ভাষাকে জলের তরঙ্গে রূপায়িত করে তোলা দুই হিমালয় কাজী নজরুল ইসলাম আর শান্ত, ধীর প্রানের উষ্ণতা ছড়িয়ে দেয়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর বিশাল মন ভোলানো পোট্রেট। সাথে অবশ্যই তাঁদের লিখা। হঠাৎ দেখে মনে হতে পারে বাদাম তলার শান বাঁধানো বেদীতে মানুষ দু’জন পাশাপাশি স্নিগ্ধ মায়াবী আলোতে বসে আছেন। এগিয়ে গিয়ে চোখ আটকে যাবে কিছু বাঁধানো বিখ্যাত মানুষের বানীতে। এটা খুব সাধারণ বিষয় হলে-ও আলাদা হয়ে যাবে নির্বাচন করার আলাদা করার মননের উৎকর্ষতার জন্য। অদ্ভুতভাবে নিজের অজান্তেই চোখ চলে যাবে সবুজে, শুধুই কী সবুজ! যে সবুজ, সবুজের সব সংঙ্গা বিলীন করে দিয়েছে। মাঠের ঘাস আপন সুরে ডেকে নিবে। পা রাখতেই জীবনের সব সুর একসাথে বেজে উঠলো। আমার সব আকুলতা আমাকে ডেকে বলছিল ডুবে যা-ও অনায়াসে, অক্লেশে।

মাঠের পাশে এক কোনে আপাদমস্তক ঘন পাতায় মোড়ানো গাছটি কে দেখে মনে হলো সবুজ ঝর্ণা। আহা কী অদ্ভুত প্রকৃতি। বসার চেয়ার গুলো আলো-আঁধারির মায়া জালে নিজেকে নিজের জন্য বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত। কী প্রশান্তি! হেঁটে হেঁটে পৌঁছে গেলাম শহীদ মিনারে। সাদা আলোর প্রশান্তি ছুঁয়ে গেলো। সাদা তো স্বচ্ছতার আয়না। বেদীর একপাশে সাদা-কালোয় সৌম্য প্রাণের ,দীপ্ত মহাপুরুষ, প্রশান্তির ছাপ ফেলে রেখে যাওয়া প্রবাদ পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ-র মুরালটির প্রতি চোখ আটকে যাবে। কোথায় নিজেকে শূন্য মনে হলো। নিজের ভিতরটা একমুহূর্তে ফাকা হয়ে যাচ্ছিলো। অদ্ভুত শুন্যতা। একই রাস্তায় হাজারো যানবাহন চলাচল করে, কিন্ত কখনো পথটুকু মসৃন হয়ে উঠে শুধু মাত্র চালকের দৃষ্টির স্বচ্ছতার জন্য। দৃষ্টির প্রসারতা মানুষকে আলাদা করে গোষ্ঠী, সমাজ আর সভ্যতার সিড়িতে। যেখানে প্রকৃতি মিশে যায়, সেখানে জীবনের সব রঙ মিশে অনন্য আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠে চারপাশ। পড়ে শিখার চেয়ে, দেখা শেখা সশিয়ে, খুজে আলাদা করার শিক্ষা যদি তৈরী করা যায়, সে মানুষ হওয়ার বিষয়টা একটু প্রথার বাইরে হওয়া স্বাভাবিক। আনন্দের সাথে শিক্ষা, বলা যতো সহজ, করা তত কঠিন। কিন্তু প্রচেষ্টা যখন মনের গভীর অনুভবের মাঝ থেকে উঠে আসে তখন তার ব্যপ্তি হয় অসীম। স্বপ্ন গুলো তখন পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে নিজেরাই সত্য রুপায়নে কঠিন হয়ে নিজেদের ভিত্তি স্থাপন করে অনায়াসে, অক্লেশে, বিশালতায়। জীবনের অনুভব গুলো তখন পরতে পরতে নিজেকে বিছিয়ে দেয়, হেঁটে যাবার পথ তৈরিতে। শুধু ইচ্ছে টা-ই পারে অসম্ভব কে সম্ভবের সোপানের শেষ অধ্যায়ের সুখ টুকু নিজের করে নিতে। সভ্যতার সোপান হিসেবে ইট – কাঠের ভীরে জীবনের আলোগুলো ধূলোর পরতে ঢাকা পড়ে যা।য়। পায়ের নিচে সবুজ ঘাসের স্পর্শ নিমেষেই নাড়া দেয় শরীরের প্রতিটি লোমকূপ। মনের সবটুকু উষ্ণতা টের পায় তার গাঢ় সবুজ, সতেজ, নির্মল অনুভব। মানুষ তো প্রকৃতির সন্তান। মিথ্যে মায়াজালে জড়িয়ে প্রকৃতিকে উপেক্ষা করে কতোখানি সফল সে সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে কিছু মানুষ থাকে যাদের সবটুকু জুড়ে থাকে সবুজের প্রতি অসহনীয় ভালোবাসা। যা তাঁর হাতের স্পর্শে প্রান খুলে হেসে ওঠে। ইট-পাথরের দালান-কোঠা গুলো কথা বলে জীবনের সাথে মিলিত সুরে। শুধু স্থাপনা দিয়ে প্রতিষ্ঠান হয় হয়তো, কিন্তু তাতে প্রানের ছোয়া দিতে পারে প্রকৃতি। প্রকৃতি মানুষের মুক্তির পথম সোপান। একটা ইট- কাঠের প্রতিষ্ঠান একজন মানুষের স্বপ্ন হয়ে কতোটা নীল, আকাশী আর সবুজে রুপান্তরিত হতে পারে। মানুষ চাইলে কী না করতে পারে! শুধু প্রয়োজন ইচ্ছের ঘুড়িটাকে নাটাই থেকে ভালোবাসা দিয়ে বেঁধে নেয়া। শিক্ষা শুধু বই তে আবদ্ধ নয়। মানুষ কে মানুষের মনুষ্যত্বের নাগাল পেতে শিখাতে পারলে, জীবনকে তার হাতে অনায়াশে তুলে দেয়া যাবে। প্রকৃতিই মানুষকে সহজ হতে শিখায়। প্রকৃতি ই ভালোবাসা নিতে ও দিতে জানে অকৃপনভাবে। অভিমানও তার সাথেই যে তা বুঝতে পারে। ভালোবাসা কতো ব্যাপক আর বিশালতার ধারক হতে পারে, তা হয়তো জানা হতো না এখানে না গেলে। এ-র সব রূপ আমার দেখা হয়নি! কিছু অংশ দেখেই আমি আপ্লূত। একজন সৃষ্টিশীল মানুষ কতোটা বদলে দিতে পারে তাঁর চারপাশ। এখানে শব্দরা প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে নিঃশব্দে, নিভৃতে। বাতাস তার কথামালা শুনিয়ে যায়। ঘাসেরা উন্মুখ হয়ে আছে কারো খালি পায়ের স্পর্শের জন্য। নিজেকে নতুন করে চেনা যায় সহজে। একা হয়েও হাজারো রঙের ফানুস উড়ানো যায় অবলীলায়। প্রানের সবটুকু প্রশান্তি ছুঁয়ে যাক এর কারিগরকে। এ-র পেছনে রয়েছেন একজন নিজের আভায় উদ্ভাসিত আলোকিত নারী বলবো না আলোকিত মানুষ, যোগ্য শিক্ষা মন্ত্রী দীপু মনি। তাঁর সাথে আছেন আলহাজ্ব সেলিম আখন্দ সহ আরো অনেকে। আর অবশ্যই বিশাল নৌকার যোগ্য মাঝি হিসেবে এতে কর্মরত সুদক্ষ শিক্ষক এবং সকল কর্মচারী বৃন্দ। আবার ও অন্তরের নির্যাস টুকু দিয়ে গেলাম……
লেখক পরিচিতি : সিনিয়র শিক্ষক

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *