সত্যিই চাঁদপুর ডুবে যাবে না!

-মোহাম্মদ নাদিম ভুইয়া
মেঘনা কন্যা চাঁদপুরকে কেউ বলেন, ‘রূপসী চাঁদপুর’, কেউ বলেন ‘ইলিশের দেশ চাঁদপুর’। আবার কেউ চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গা মধুকরের পালতোলা জাহাজের নোঙর খুঁজে বেড়ান চাঁদপুর জনপদে। এভাবেই নানাজনের নানা ভাবনায় সুদীর্ঘ সময়ের ঐতিহ্য আর আদর্শের নীরব সাক্ষী চাঁদপুর। মেঘনা-ডাকাতিয়া আর ধনাগোদা নদীর জলধারায় বিধৌত বাংলাদেশের অন্যতম বাণিজ্য বসতির জনপদ ও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌবন্দর শহর এই শ্যামলী চাঁদপুর। জেলার সদর দপ্তরও চাঁদপুর শহরে অবস্থিত।

 

বাংলাদেশের উত্তরের হিমালয় পর্বতমালার সৃষ্টি হয়েছিল কোটি কোটি বছর পূর্বে এক বিরাট ভূ-বিপর্যয়ের মাধ্যমে নিমজ্জিত মহাসমুদ্রগর্ভ থেকে। কোটি বছর থেকে হিমালয়ের বিশাল পার্বত্য এলাকায় বৃষ্টি ও উষ্ণতায় বরফ গলা পানি যা দক্ষিণে সমুদ্রের দিকে নেমে আসা অসংখ্য নদ-নদী দিয়ে হিমালয় পর্বতমালা থেকে কোটি কোটি টন বালি মাটি নেমে আসছে প্রতি বছর এদেশের নিম্ন এলাকায়। এমনিভাবে সৃষ্টি হয়েছে ভারত ও বাংলাদেশের বিশাল পলিমাটি এলাকার এই পলল সমভূমি। এ অঞ্চলের বয়স সবচেয়ে কম। এই পলিমাটি অঞ্চল এখনো বেড়েই চলেছে। চাঁদপুর জেলার বেশিরভাগ অংশ সৃষ্টি হয়েছে হাজার প্রায় দেড় হাজার বছর আগে।

 

বৈশ্বিক জলবায়ূ পরিবর্তন এবং সমুদ্র-পৃষ্ঠা উপরে উঠে আসার কারণে এই শতকের মধ্যেই বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের একটি বড় অংশ ডুবে যাবে এই কথাটা আজকাল প্রায়শই শুনা যায়। কেউ কেউ এ কথাও বলছেন যে বাংলাদেশের প্রায় ২০% অঞ্চল সমুদ্র গহবরে তলিয়ে যাবে। যদি সত্যি ২০% অঞ্চল ডুবে যায় তাহলে সেখানে বসবাসরত ৪ কোটি মানুষের ঠাঁই হবে কোথায়? উল্লেখ্য,এক লক্ষ বছরেরও আগে সমুদ্রপৃষ্ঠা এখনকার তূলনায় ৬ মিটার উপরে ছিল এবং বাংলাদেশের সমুদ্রতটরেখা তখন টাঙ্গাইলের মধুপুর এবং রাজশাহীর বরীন্দ্র অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের অর্ধেকেরও বেশী অংশ সমুদ্রের নীচে ছিল।বাংলাদেশের ৮০% অঞ্চলই নদী প্লাবন ভূমি এবং বঙ্গীয় ব-দ্বীপের অংশ, যা কিনা সমুদ্র-পৃষ্ঠা উঠানামা সত্বেও পলি স্তরায়নের মাধ্যমে শুধু ঠিকেই থাকেনি বরং সমুদ্রের দিকে অগ্রসর হয়েছে।রেন্নেল (Rennel) নামের একজন ইংরেজ প্রথম উপমহাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানচিত্র তৈরী করেন ১৭৮০ সনে। সেই মানচিত্রের সঙ্গে বর্তমান সময়ের উপকূলীয় মানচিত্রের তুলনা করলে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের পশ্চিমাঞ্চল গত ২০০ বছর ধরে মোটামুটিভাবে একই স্থানে থাকলেও, পূর্বাঞ্চলের অনেক জায়গাতেই ভূমির পরিমাণ অনেক বেড়েছে। ভোলা, হাতিয়া সহ বৃহত্তর বরিশাল, নোয়াখালী জেলার অনেক অঞ্চল গত দুইশত বছরে প্রায় ৮০ কিঃমিঃ সমুদ্রের দিকে অগ্রসর হয়েছিল। এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে সমূদ্র-পৃষ্ঠা উপরে উঠে আসার বাৎসরিক গড় হার হচ্ছে ৪ থেকে ৮ মিঃমিঃ, অর্থাৎ একই সময়কালে ভূমি-উচ্চতা বাড়ার পরিমাণ সমুদ্র-পৃষ্ঠা উপরে উঠে আসার চেয়েও বেশীই ছিল। এক গবেষনায় দেখা যায় যে ১৯৭৩-২০০০ সময়কালে, উপকূলীয় অঞ্চলের কোন কোন স্থানে ভূমিক্ষয় হলেও প্রতি বছর গড়ে ভূমির পরিমাণ ১৮ বর্গ কিঃমিঃ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

একটি projection কিন্তু সত্য কথা, তাপদাহ বাড়ছে। শৈত্যপ্রবাহ বাড়ছে। জল ও বায়ুচক্রে টালমাটাল পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়ছে। সাগর-মহাসাগর উত্তপ্ত হচ্ছে, লোনা জল উপকূলে ঢুকছে। ঋতুচক্রে পরিবর্তন খোলা চোখে দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের নিচের দিকে ২০% এর বেশী জায়গার উচ্চতা ২ মিটারেরও কম, এবং যদি সমুদ্র-পৃষ্ঠা ২ মিটার বেড়ে যায় তাহলে সমুদ্রতটরেখা বর্তমানের উপকূলীয় জেলাগুলি ছাড়িয়েও চাঁদপুর, ব্রাম্মনবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা এবং সুনামগঞ্জ জেলাসমুহের কোন কোন অঞ্চলে ঢুকে পড়বে।যে কারনগুলি নজরে এসেছে, তার মধ্যে বর্তমানের অত্যদিক বিলাসবহুল জীবনযাত্রার ফলশ্রুতিতে অনেক বেশী পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমনের কারনে সৃষ্ট গ্রীন-হাউজ-এফেক্টে,অপরিকল্পিত বেড়ীবাঁধ নিন্মভূমি অঞ্চলকে নদী এবং জোয়ারভাটার প্লাবন থেকে আলাদা করে ফেলছে, যার ফলে প্রাকৃতিক পলিস্তরায়নে বিঘ্ন সৃষ্টি, তৈরি হচ্ছে স্থায়ী জলাবদ্ধতা এলাকা।অপরদিকে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠির প্রয়োজন মেটানোর জন্য ভূমি কর্ষন ,নদী থেকে ইচ্ছামত বালু উত্তোলন এবং ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে ভুমিক্ষয় এবং অবঃধমনের কারণেও ভূমি-উচ্চতা হ্রাস পাচ্ছে, যার জন্য সমুদ্র-পৃষ্ঠার তুলনায় উপকূলীয় ভূমি-গঠন এবং উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছেনা।

আশার কথা,বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় গ্রহণের পর সরকার কর্তৃক ২০০৯ সালে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্ম পরিকল্পনা ২০০৯ (বিসিসিএসএপি, ২০০৯) চুড়ান্ত করা হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম এই ধরণের সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহন করে।জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বলবৎ করা হয় জলবায়ু ট্রাস্ট আইন-২০১০। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলিষ্ঠ উদ্যোগে উন্নত দেশের অর্থ প্রাপ্তির জন্য অপেক্ষা না করে নিজস্ব অর্থায়নে এ ধরণের তহবিল গঠন বিশ্বে প্রথম যা আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বিশেষভাবে প্রসংশিত হয়েছে।

 

ঐতিহ্যবাহী এক সময়ের মহকুমা শহর, ‘‘Gate way of Eastern India” জেলা চাঁদপুর রক্ষায় সরকার সহায়তার সাথে সকলেই সচেতন ও সচেষ্ট থাকলে কখনোই ডুবে যাবে না। শত নয়, হাজার বছরের প্রাচীন এই জনপদসহ ‍দেশ তথা বাংলাদেশ আমাদের জন্মভূমি,টিকে থাকুক যুগান্তরে।

সংকণন সহায়তায় তথ্য লিংক:

১।’http://www.chandpur.gov.bd/site/page/

২।’https://blog.bdnews24.com/Khaleq/60309?

৩।’http://www.bcct.gov.bd/site/page/।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *