সবাই টিকা নিবেন এবং সকলকে টিকা নিতে উৎসাহিত করবেন : শিক্ষামন্ত্রী

চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালের সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্লান্ট উদ্বোধন

: নিজস্ব প্রতিবেদক :
৪ আগস্ট ভার্চুয়াল আনুষ্ঠানিকতায় উদ্বোধন করা হলো চাঁদপুরের সেন্ট্রাল লিকুইড অক্সিজেন প্লান্ট। চাঁদপুরের সিভিল সার্জন মোঃ সাখাওয়াত উল্লাহর সঞ্চালনায় এ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি। জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন পুলিশ সুপার মোঃ মিলন মাহমুদ, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ডাঃ জেআর ওয়াদুদ টিপু ও চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি ইকবাল হোসেন পাটওয়ারী।
শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং ইউনিসেফের উদ্যোগে চাঁদপুরে যে সেন্ট্রাল লিকুইড অক্সিজেন প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে, তা আজ উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। এটি বর্তমানে করোনা পরিস্থিতিতে খুবই কাক্সিক্ষত এবং প্রয়োজন ছিলো। এজন্যে আমি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং ইউনিসেফকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।
তিনি বলেন, আপনারা জানেন, চাঁদপুরে আগে সেন্ট্রাল অক্সিজেনের ব্যবস্থা ছিল না। ভাষাবীর এমএ ওয়াদুদের পরিবারের পক্ষ থেকে চাঁদপুর হাসপাতালে ৩০টি সেন্ট্রাল অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। যা দিয়ে তাৎক্ষণিক করোনা রোগীদের চাহিদা মিটানো সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু বিগত কয়েক মাস যাবত সারাদেশের ন্যায় চাঁদপুরেও করোনা রোগী বেড়ে যাওয়ায় আমরা হিমশিম খাচ্ছিলাম। এরই মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ইউনিসেফ এবং যে প্রতিষ্ঠানটি এই অক্সিজেন প্লান্টটি স্থাপন করেছে, তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এই প্লান্টটি দ্রুত স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া আবুল খায়ের গ্রুপ যে পরিমাণ অক্সিজেন দিয়ে সহায়তা করেছে, সেজন্যে তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই। তিনি বলেন, পৃথিবীর কোনো দেশেরই সরকার দেশের চাহিদার সমস্ত সেবা একা মিটাতে পারে না। এজন্য বেসরকারি ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক সহযোগিতার প্রয়োজন হয়েছে। আমাদের দেশেও তাই। এই করোনাকালীন মুহূর্তে চাঁদপুরে যেভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানুষগুলো সহায়তার হাত বাড়িয়েছে, তা বিবরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না।
তিনি বলেন, করোনাকালীন সারাবিশ্বের স্বাস্থ্যসেবা ভেঙ্গে গেছে। আমাদের দেশের সরকারও নানা অপ্রতুলতার ভেতর দিয়ে কাজ করছে। ইনশাল্লাহ আমরা অতি শীঘ্রই স্বাস্থ্য খাতের এই কঠিন সমস্যার সমাধান করতে পারবো। তিনি এলাকাভিত্তিক বিত্তশালীদের দেশের এই সময়কালে অসহায় ও দুঃস্থ মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।


শিক্ষামন্ত্রী বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডাকে আমাদের দেশের রাজনৈতিক কর্মীরা যে যার সক্ষমতার মধ্য দিয়ে দেশের ক্রান্তিকালে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে, প্রতিবেশিকে সহযোগিতা করছে, সহায়তা করছে এটাই বাংলাদেশ, এটাই বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ। তিনি চাঁদপুরের প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আমাদের প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী যেভাবে দিন-রাত কাজ করছে, অসহায় দুঃস্থদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, যা বিশ্ববাসীর কাছে মডেল হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, করোনাকালীন সময়ে সারাবিশ্বে একটি মানবিক সংকট চলছে। কারো দরকার হচ্ছে চিকিৎসা সেবা, কারো দরকার হচ্ছে খাদ্য চাহিদা। আমাদের শেখ হাসিনার সরকার যা অত্যন্ত সুচারুভাবে সমাধানের চেষ্টা করছে।


ডাঃ দীপু মনি বলেন, আমাদের সরকার আগামী ৭ আগস্ট থেকে ৭ দিনের মধ্যে দেশের ১ কোটি মানুষকে টিকা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আপনারা সবাই টিকা নিয়ে নিবেন এবং সকলকে টিকা নিতে উৎসাহ প্রদান করবেন। সকলকে মাস্ক পরার জন্যে উৎসাহ প্রদান করবেন। পরিশেষে তিনি চাঁদপুর ২৫০ বেডের হাসপাতালের সেন্ট্রাল লিকুইড অক্সিজেন প্লান্টের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ তাঁর বক্তব্যে বলেন, অবশেষে চাঁদপুরবাসীর স্বপ্নের লিকুইড অক্সিজেন প্লান্ট চালু হয়েছে। এতে শুধু চাঁদপুরেরই নয়, শরীয়তপুর, মুন্সিগঞ্জ, লক্ষ্মীপুরের করোনা আক্রান্ত মানুষগুলো এই অক্সিজেন প্লান্টের মাধ্যমে সেবা পাবে। আমরা চেষ্টা করছি, আগামী ৭ তারিখ থেকে শুরু হওয়া ৭ দিন ব্যাপী চাঁদপুরের সকলকে করোনার টিকার আওতায় নিয়ে আসতে পারবো।
তিনি বলেন, আমাদের প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। এতে কিন্তু প্রশাসনের কোনো কার্যক্রমই থেমে নেই। আমরা চাঁদপুরের সকল শ্রেণীর মানুষকে সম্পৃক্ত করে দেশের এই দুর্যোগময় সময়ে কাজ করে যাচ্ছি। অবশেষে তিনি সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।
পুলিশ সুপার মিলন মাহমুদ বলেন, চাঁদপুরবাসীর জন্যে দুটি আনন্দের সংবাদ। এক হলো আজ সেন্ট্রাল লিকুইড অক্সিজেন প্লান্ট চালু হচ্ছে এবং অপরটি হলো ভাষাবীর এমএ ওয়াদুদ আরটি পিসিআর ল্যাব প্রতিষ্ঠার বছর পূর্তি হয়েছে কিছুদিন আগে। তিনি বলেন, চাঁদপুরবাসীর প্রয়োজনীয় সকল চাহিদা আমাদের মন্ত্রী মহোদয় সর্বদা পূরণ করছেন, সেজন্যে মন্ত্রী মহোদয়কে চাঁদপুর পুলিশ বাহিনী ও চাঁদপুরবাসীর পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাই। চাঁদপুরে করোনার সময়কালে শিক্ষামন্ত্রীর সহায়তায় যেমনটা রোগীর জন্য অক্সিজেন চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে, তেমনি চাঁদপুরের অসহায় মানুষদের জন্যে খাদ্য ঘাটতি বা খাদ্য চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এই করোনাকালে চাঁদপুর পুলিশ বাহিনীর অনেকেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। শুধু চাঁদপুর সদরেই নয়, চাঁদপুরের প্রতিটি থানাতেই বেশ কিছু পুলিশ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। তারপরও আমরা চাঁদপুরের মানুষের শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার্থে স্বল্প জনবল দিয়েই কাজ করে যাচ্ছি।
অনুষ্ঠানের শুরুতে চাঁদপুরের সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, আজকে আমাদের জন্যে একটা আনন্দের দিন। চাঁদপুরের ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে লিকুইড অক্সিজেনের মাধ্যমে করোনা রোগীদের সরাসরি অক্সিজেন প্রদান করা হবে, চাঁদপুরবাসীর সাথে আমরাও আনন্দবোধ করছি। শুধু তাই নয়, কয়েকদিন আগে চাঁদপুরে স্থাপিত ভাষাবীর এমএ ওয়াদুদ আরটি পিসিআর ল্যাবের ১ বছর পূর্তি হলো। গত ১ বছরে এই ল্যাবের মাধ্যমে করোনা আক্রান্ত কি-না, তার প্রায় ৩৫ হাজার পরীক্ষা করেছি। যেটা আমাদের জন্য বিশাল অর্জন। এই ল্যাব শুরু হওয়া থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত ১ দিনের জন্যও বন্ধ হয়নি। এমনকি ঈদের দিন ও প্রতি শুক্রবার এই ল্যাবের কার্যক্রম চলমান ছিল। এই ল্যাবের কারণে আমরা করোনা রোগীদের সিলেক্ট করে তাদের ও তাদের পরিবারকে আইসোলেশনে আনতে পেরেছি।
সিভিল সার্জন বলেন, করোনা রোগীর প্রথম চিকিৎসা হলো অক্সিজেন। এই অক্সিজেন নিয়ে আমরা কিছুদিন সংকটে ছিলাম। এরই প্রেক্ষিতে আপনার ও আপনার পরিবারের আরেকজন সদস্য টিপু ভাইয়ের সহযোগিতায় এখানে যে অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপিত হয়েছে, এর মাধ্যমে আমরা রোগীদের সঠিক নিয়মে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারবো। ফলে আমরা চেষ্টা করবো কেউই যেন অক্সিজেনের অভাবে মারা না যায়। আমরা আশাবাদী ভবিষ্যতে এই অক্সিজেনের জন্যে মৃত্যুর হার কমে যাবে।
জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ডাঃ জে আর ওয়াদুদ টিপু বলেন, এই সেন্ট্রাল লিকুইড অক্সিজেন প্লান্ট উদ্বোধনের পরপরই চাঁদপুর সদর হাসপাতালে এর স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হবে ভেবেই প্রশান্তি পাচ্ছি। এর মাধ্যমে আশা করি চাঁদপুরের করোনা রোগীরা কষ্ট লাঘব করে সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পারবে।
অক্সিজেন সিলিন্ডার বিষয়ে ডাঃ জে আর ওয়াদুদ টিপু বলেন, চাঁদপুরে অক্সিজেন সিলিন্ডারের যততত্র ব্যবহার হচ্ছে। মনে রাখতে হবে এই সিলিন্ডারের মাধ্যমে যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরনের অঘটন ঘটতে পারে। চাঁদপুর সদর হাসপাতালে করোনার অনেক রোগী প্রয়োজনীয় ঔষধ কিনতে পারছে না। আপনারা অক্সিজেন সিল্ডিারের প্রতি মনোনিবেশ না করে রোগীর ঔষধ কিনার ব্যবস্থা করেন। প্রয়োজনে জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জনের সাথে যোগাযোগ করে রোগীদের ঔষধের ব্যবস্থা করেন।
তিনি শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ করেন যে, এই অক্সিজেন প্লান্ট থেকে চাঁদপুর সদর হাসপাতালে ১৫০টি বেডে সাপ্লাই দেয়ার কথা। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মাত্র ৫০টি অক্সিজেন মিটার প্রদান করেছে। বাকি ১০০টি বেডে এখন অক্সিজেন সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। আমি মাননীয় মন্ত্রীকে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান স্পেক্ট্রার সাথে যোগাযোগ করে বাকি ১০০টি অক্সিজেন মিটার সংগ্রহ করে পুরোপুরি ১৫০ বেডে অক্সিজেন চালু করার ব্যবস্থা করার অনুরোধ করছি।
চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি ইকবাল হোসেন পাটওয়ারী তাঁর বক্তব্যে বলেন, চাঁদপুরবাসীর অনেক প্রতিক্ষার অবসান হলো এই অক্সিজেন প্লান্টের উদ্বোধনের মাধ্যমে। বিশেষ করে আমাদের শিক্ষামন্ত্রীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই অসাধ্য কাজটি চাঁদপুরবাসী উপভোগ করতে পারবে। এই অক্সিজেন প্লান্টের মাধ্যমে শুধু আমরা চাঁদপুরবাসীই উপকৃত হবো না, এর মাধ্যমে শরীয়তপুর, লক্ষ্মীপুর, মুন্সিগঞ্জসহ আশপাশের বেশ কিছু জেলার মানুষ উপকৃত হবেন।
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন ফরিদগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডঃ জাহিদুল ইসলাম রোমান, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডঃ মজিবুর রহমান ভূঁইয়া, সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী বেপারী, চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডাক্তার সুজাউদ্দৌলা রুবেল, আবাসিক সার্জন ডাক্তার মাহমুদুন্নবী মাসুম, শিক্ষামন্ত্রীর চাঁদপুরস্থ প্রতিনিধি অ্যাডঃ সাইফুদ্দিন বাবু, চাঁদপুর জেলা যুবলীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক মাহফুজুর রহমান টুটুল, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. দিদারুল আলমসহ সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *