অস্তিত্ব বিপন্নের পথে চাঁদপুরের লবণ শিল্প : ৩৬টি মিলের মধ্যে সচল মাত্র দু’টি

আশিক বিন রহিম :
পদ্মা-মেঘনা এবং ডাকাতিয়াকে ঘিরে প্রাচীণ বাণিজ্যিক এলাকা চাঁদপুর একটা সময় পাট শিল্পের পাশাপাশি লবণ শিল্পের জন্যেও বিখ্যাত ছিলো। দেশের অন্যতম নদী বন্দর এই জেলার প্রধান ব্যবসায়িক এলাকা পুরাণবাজারে ডাকাতিয়া নদীর তীরে গড়ে উঠে অর্ধশত ছোট-বড় লবণ মিল। এর মধ্যে গত তিন-চার দশকে ৩৬টি মিল ছিল সচল। কিন্তু প্রতিযোগতামূলকভাবেই গড়ে ওঠা এই বিপুলসংখ্যক লবণ মিলে উৎপাদনও ছিলো বেশ। অথচ কালের পরিক্রমায় চাঁদপুরের সেই জৌলুসভরা লবণ শিল্পের আজ অস্তিত্ব বিপন্নের পথে। ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে পড়ছে লবণ মিলগুলো। সর্বশেষ চলতি বছরের মালিকের মৃত্যুজনিত কারণে ১টি লবণ মিল বন্ধ হয়ে বর্তমানে ২টি মাত্র লবণ মিল সচল রয়েছে। এতে করে বেকার হয়ে পড়ছে ওই এলাকার হাজার হাজার লবণ শ্রমিক।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ধান, পাট, মরিচ, সরিষা, তিল, পেঁয়াজ, রসুন, মুগ, খেসারি, মশারি, গম, ভুট্টা, ছোলা, ডাল, আলু ও অন্যান্য সকল প্রকার রবি ফসল ও শাক-সবজি উৎপাদনে চাঁদপুরের নামটি ছিল খ্যাতির শীর্ষের তালিকায়। এখানে আটা, ময়দা, চাল, বিস্কুটসহ বিভিন্ন কারখানাও ছিল বেশ। এর মধ্যে অনেক কিছুই অস্তিত্ব শেষ হয়ে গেলেও কিছু কিছু জিনিস বেচা-কেনার প্রধান মোকাম এখনও চাঁদপুর পুরাণবাজার। যার ফলে নদীপথে যাতায়াত এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধার্থে পুরাণজারে একের পর এক গড়ে ওঠে লবণ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। হাজার হাজার লবণ শ্রমিক দিন-রাত পালাক্রমে জীবন-জীবিকার জন্যে মিলগুলোতে কাজ করতো।
পুরাণবারের বেশ কয়েকজন প্রবীণ ব্যবসায়ীর সাথে আলাপ করে জানা যায়, ১৯৮০ সালের পর থেকে চাঁদপুরে প্রচন্ড নদীভাঙ্গন ও বন্যাসহ বেশ ক’টি প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দেয়ার কারণে পুরাণবাজারের ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব দেখা দেয়। এরপর ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় লবণ মিলগুলোতে রক্ষিত কাঁচা লবণ ভেসে যাওয়ার কারণে মালিকরা অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক লোকসানের সম্মুখীন হয় এবং ব্যাংক ঋণখেলাপি হয়ে পড়ে। এছাড়াও বাজার দখল করে বিভিন্ন অঞ্চলের প্যাকেটজাত লবণ। ফলে একের পর এক লবণ মিলগুলো বন্ধ হয়ে যায়।
১৯৯০-১৯৯১ সালে দেশের আয়োডিনজনিত অভাবের সমস্যা সমাধানে ইউনিসেফের সার্বিক সহায়তায় চাঁদপুরের ৩৬টি লবণ মিলের মধ্যে ২৫টি মিলে আয়োডাইজসড প্ল্যান্ট বসানো হয়। যার প্রতিটির তৎকালীন মূল্য ছিল সাড়ে ৭ লাখ টাকা। এর সাথে কর্মরত শ্রমিক, মালিক ও মিল ম্যানেজারদের প্রশিক্ষণ ও ২০০০ সাল পর্যন্ত বিনামূল্যে আয়োডিন দেয়া হতো। অভিজ্ঞ ও ক্ষতির সম্মুখীন ব্যবসায়ীরা মনে করেন এই লবণ শিল্পের ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনার জন্য একটি সুসংগঠিত পরিকল্পনা হাতে নেয়া দরকার।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *