চাঁদপুরে অনিশ্চয়তায় ৩ শতাধিক বেদে পরিবারের জীবন-জীবিকা

আশিক বিন রহিম :
বছর দেড়েক আগেও গ্রামের পর গ্রাম পায়ে হেঁটে মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরে টাকা উপার্জন করেছে চাঁদপুরের বেদে পল্লির অনেক নারী। তবে ভিক্ষাবৃত্তি নয়, একদম গতরখাটা পরিশ্রমের মাধ্যমেই এই অর্থ উপার্জন করতেন তারা। সিঙ্গা লাগানো, দাঁতের পোকা ফেলা, নাভিকাটা, ঔষদ বিক্রি ছিলো তাদের প্রধান পেশা। কেউ কেউ আবার ঝুঁড়িতে করে কাচের আসবাবপত্রও বিক্রি করেছে। দিনভর গতরখেটে ৩শ’ টাকা থেকে ৪শ’ টাকা আয় হতো তাদের। আর পুরুষরা নদীতে বরশী ফেলে মাছ শিকার করতো। এতেই খেয়েপরে ভালো চলছিলো জীবন তাদের।
কিন্তু মহামারি করোনা ভাইরাস অন্যান্য পেশার মতো তাদের ক্ষুদ্র পেশায়ও আঘাত হেনেছে। তাদের কাছ থেকে সিঙ্গা লাগানো, দাঁতের পোকা ফেলা, নাভিকাটা এমনকি ঔষদ ক্রয়েও অনাগ্রহ বেড়েছে গ্রাম-গঞ্জের মানুষের। যার ফলে এখন বাড়িতে বসেই এক প্রকান বেকার দিন কাটছে তাদের। এতে স্বামী-সন্তান নিয়ে জীবন-যাপনে চরম সঙ্কটময় সসয় পার করছে তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চাঁদপুর শহরের ডাকাতিয়া নদীর তীর প্রেসক্লাব ঘাট, ১০নং চৌধুরী ঘাট ও ৫নং ঘাটের বেদে পল্লীতে প্রায় ৫শতাধিক বেদে পরিবারের বসবাস। ঝড়, বৃষ্টি, বর্ষা, শীত সব মৌসুমেই নদীর উপরে ভাসমান অবস্থায় নৌকায় বসবাস এ জনগোষ্ঠীর। তবে গত কয়েক বছর ধরে তারা ওই এলাকায় নদীর পড়ের তাবু গেড়ে, বাঁশের মাচা দিয়ে স্থায়ী আবাস গড়েছে। এই সওদাগর জনগোষ্ঠীর লোকেরা নিজেদের গোষ্ঠির লোক ছাড়া অন্য জনগোষ্ঠীরর মানুষকে বিবাহ না করার প্রথা রয়েছে। তবে এদের বেশীর ভাগই ইসলাম ধর্মের অনুসারী।
চাঁদপুর ডাকাতিয়া নদীর তীরে এসব বেদে পল্লী ঘুরে দেখা যায়, ছোট ছোট নৌকার উপর রান্নাবান্নার কাজসহ তারা নৃত্য প্রয়োজনীয় কাজগুলো সেরে নিচ্ছেন। কেউ কেউ আবার নৌকার পাশে নদীতীরে অথাৎ ডাঙ্গায় বাঁশের মাঁচা উপর টিন দিয়ে ছোট ছোট ঝুপড়িঘর বানিয়েছে। তবে এর সংখ্যা খুব একটা বেশি না। আবার ডাঙ্গায় থাকা ঘরগুলো খরার মৌসুমে কাজে আসলেও বর্ষার সময় নৌকাই তাদের আশ্রয়স্থল।
নৌকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করা বেদে রেজিয়া বেগম, আব্দুল করিম, শাহনাজ বেগমসহ কয়েকজন জানায়, আমরা মূলত পেশা ছিলো সিঙ্গা লাগানো, দাঁতের পোকা ফেলা, নাভিকাটা, ঔষদ বিক্রি। আবার ঝুঁড়িতে করে কাচের আসবাবপত্রও বিক্রি করেছি। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারনে মানুষ এখন এমব করতে চায় না।
হাছান রাজা, মালেক, করিমুল্লাসহ অন্যান্যরা জানায়, আমরা পুরুষরা সাধারণত নদীতে জাল ও বরশি দিয়ে মাছ ধরে থাকি। বর্তমানে এর থেকে যা টাকা পাই তা দিয়ে কোন রকম সংসার চলে। তবে ঝড়, তুফান হলে অনেক সময় না খেয়ে থাকতে হয়।
নিজেদের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে ৫নং ঘাট ও ১০ নং চৌধুরী ঘাটে বসবাসরত সওদাগরদের সর্দার মালেক সওদাগর জানান, আমাদের এখানে প্রায় ৩ শতাধিক পরিবার রয়েছে। বেশ কয়েকবার আমরা জেলা প্রশাসক বরাবর ঘর পাওয়ার আবেদন করেছি।
পরবর্তীতে আমাদেরকে গুচ্ছগ্রামে থাকার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেওয়া হলেও তা এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। আমরা এই অঞ্চলের ভোটার হয়েও কেন নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি তা খতিয়ে দেখতে চাঁদপুরের উন্নয়নের রুপকার শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি এমপি আপাসহ সংশ্লিষ্ট মহলের দ্রুত সুদৃষ্টি কামনা করছি।
এ ব্যপারে চাঁদপুর সদরের ইউএনও সানজিদা শাহনাজ জানান, আমাদের এখন আশ্রয়ণ প্রকল্পের কোন ঘর খালি নেই, এমনকি গুচ্ছগ্রামও খালি নেই। এগুলো সংস্কার চলছে। তা শেষ হলে আমরা ওদের জন্য কাজ শুরু করবো।
তাছাড়া আমরা নতুন আশ্রয়ন প্রকল্পের বাড়ী নির্মাণ করার উদ্যোগ নিচ্ছি। যেখানে এরকম বেদে সম্প্রদায়, হরিজন সম্প্রদায়ের লোককে থাকতে দেওয়া হবে।কিন্তু জায়গা নির্ধারণ করতে না পারায় আমরা এখনো এই কাজ শুরু করতে পারিনি।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *