চাঁদপুরে পাটের সোনালী আঁশ ছাড়াতে ব্যস্ত কৃষাণ-কৃষাণীরা

আশিক বিন রহিম :
বর্ষার ভরা মৌসুমে পাট কাটা এবং পাট থেকে সোনালী আঁশ সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাঁদপুরের কৃষকরা। পাট উত্তোলনের এই পূর্ণ মৌসুমে জেলার গ্রামাঞ্চলের কৃষকরা এখন ব্যস্ততার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ব্যস্ততার কমতি নেই পরিবারের নারী সদস্যদেরও। ক্ষেত কেটে আনা গাছ পাট মুঠি বেঁধে দীর্ঘদিন পানিতে ভিজিয়ে রাখছেন পুরুষরা। আর বাড়ির নারীরা সেই পাট থেকে আঁশ ছেড়ে পাটকাঠি এবং পাট আলাদা করছেন। শুধু তাই নয়, এ কাজে সহযোগীতা করছে পরিবারের শিশু-কিশোর সদস্যরাও।
প্রতিবছরই বর্ষামৌসুমে চাঁদপুরের প্রতিটি গ্রামাঞ্চলে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে যখন বর্ষার পানিতে খাল-বিল, ডোবা-নালা ভরে ওঠে সোনালী স্বপ্ন নিয়ে সোনালী আঁশ ঘরে তুলতে কৃষক-কৃষাণীর এমন ব্যস্ততা দেখা মিলে।
সরেজমিনে চাঁদপুর জেলার হাইমচর, ফরিদগঞ্জ ও মতলবসহ বিভিন্ন উপজেলার অঞ্চলে ঘুরে দেখা যায়, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, নারী-পরুষ মিলে বাড়ির রাস্তার পাশে কিংবা বাড়ির উঠোনে বসে গাছ পাট থেকে আঁশ সংগ্রহ করছেন। চুলোয় রান্নার কাজে পাটকাঠির চাহিদা থাকায় কৃষকদের সঙ্গে প্রতিবেশিরাও আঁশ ছাড়িয়ে দিয়ে পাটকাঠি সংগ্রহ করছেন। এখন চলছে পাটের আঁশ ছাড়ানো ও রোদে শুকানোর কাজ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ডোবা ও বিলের পানির মধ্যে জাগ (পচাতে) দেওয়া পাট থেকে আঁশ ছাড়াচ্ছেন তারা।
মতলব দক্ষিণ উপজেলার এয়ারপোর্ট গ্রামের একটি বাড়ির রাস্তায় পাটের আঁশ তুলতে ব্যস্ত রাহেলা খাতুন, বিবি বেগম, ফজিলত বানুসহ বেশ কয়েক মাধ্যবয়সী নারী জানান, তারা মূলত গাছ পাট থেকে আঁশ এবং পাটকাঠি আলাদা করার কাজ করে থাকেন। এর বিনিময়ে তারা আঁশ ছাড়ানো অর্ধেক পাটকাঠি পান। এসব পাটকাঠি তারা শুকিয়ে মাটির চুলায় রান্নার কাজে এবং ঘরের বেড়া দেয়ার কাজে ব্যবহার করে থাকেন। কেউ কেউ আবার মুঠা করে বিক্রি করে থাকেন।
একই গ্রামের মুসলিম মিয়া, বারেক গাজীসহ বেশ ক’জন কৃষকের সাথে আলাপ করে জানা যায়, তারা বগি এবং সুতি পাট- এ দুই জাতের পাট গাছ চাষ করে থাকেন। গত কয়েক বছর ধরে পাটের মূল্য কমে যাওয়ায় পাট চাষের প্রতি অনেকটা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন তারা। তবে গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর পাটের মুল্য কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। দু’বছর পূর্বে ১মণ পাটের মূল্য ছিলো ১৩ থেকে ১৪শ’ টাকা, এ বছর ১ মণ পাটের দাম ২৫শ’ থেকে ৩ হাজার টাকা বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন পাট চাষীরা।
তারা আরো জানান, এ এলাকায় পাটের আঁশের পাশাপাশি জ্বালানি হিসেবে পাটকাঠির প্রচুর চাহিদা রয়েছে এবং দামও বেশ ভালো পাওয়া যায়। এসব পাটকাঠি জ্বালানি ছাড়াও ঘরের বেড়া, চালাসহ নানাবিধ কাজে লাগে।
এক সময়ে দেশের প্রধান অর্থকারী ফসল ছিলো পাট। পাটকে সোনালি আঁশ বলা হতো। কিন্তু পলিথিনের অবাদ ব্যবহারে সঠিক দাম না পাওয়ায় একটা সময় এ সোনালি আঁশ কৃষকের গলার ‘ফাঁস’ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তখন অনেক কৃষকই পাট চাষ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পাটের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষকরা পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। ইংরেজ শাসনামল থেকে স্বাধীনতা পরাবর্তি সময়েও চাঁদপুরে পাটের বড় বাজার ছিলো। নদী বন্দর শহর হওয়ায় এখানে বৃহৎ পরিসরে দুটি পাটকল বা জুটমিল গড়ে উঠে। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির কাছে নতজানু হয়ে পাটের সেই গৌরব ম্লান হতে শুরু হবে। চাঁদপুরেও পাটকে ঘিরে সেই জৌলুশ হারাতে থাকে। তবুও এটি আজো বাংলাদেশের সোনালী আঁশ হিসেবে পরিচিত। আর এই সোনালী আঁশ সংগ্রহ করতে পেরে কৃষকদের মুখেও হাসি ফুটে উঠছে।
মতলব উপজেলার বড়দী আড়াং বাজার এলাকায় এভাবেই ছোট ছোট নৌকা তৈরি করে সড়কের পাশে সাজিয়ে রাখতে দেখা যায়। আর সেখান থেকেই যাদের প্রয়োজন তারা সুবিধামতো দাম অনুযায়ী তাদের নৌকা ক্রয় করেন।

 

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *