ডিসির বাংলো পাখির অভয়ারণ্য

ইকবাল হোসেন পাটোয়ারী :
চাঁদপুর শহরের ঠিক মাঝ বরাবর ডাকাতিয়া নদীতীর ঘেঁষা যে বাংলো বাড়িটি, যার চার ধার ঘনসবুজে ঘেরা, সারি সারি আম নারকেল গাছ- সেটিতে বাস করেন চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের কর্ণধার জেলা প্রশাসক। সুপ্রাচীন শহরের এই বাংলোতে জেলা প্রশাসকের পাশাপাশি আবাসস্থল গড়ে তুলেছে শত শত পাখিরা! রীতিমত পাখিদের অভয়ারণ্য। সাদা ও ক্ষয়রি বক, পানকৌড়ি, নানা জাতের শালিক, ঘুঘু, কাক, কোকিল, গাংচিল, মাছরাঙা, হরোলি, টিয়া, ইষ্টিকুটুম, কাকঠোঁকরা, বুলবুলি, দোয়েল- এরা কেউ আর বাদ নেই! যে যেভাবে পারছে জায়গা করে নিয়েছে। কি গ্রীষ্ম কি বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত- সবকালেই এদের কলোকাকুলিতে মুখরিত এই বাংলো এবং এর আশপাশের নিবাসস্থল ও সড়ক জনপথ। বিশেষ করে এর লাগুয়া চাঁদপুর ২৫০ শয্যা হাসপাতালের অনেক রুগীর সকালের ঘুম ভাঙে এর কিচির মিচির নয়তো কা কা কক্ কক্ শব্দে। এর সামনে শহরের সবচেয়ে টিপটপ হিলশা হোটেল আর চাঁদপুর প্রেসক্লাব ভবনের চাইনিজ রেষ্টুরেন্টে আসা কাস্টমাররাও অনতিদূর থেকে তাদের বিচরণ অবলোকন করে। দূরের কোন অতিথি চাঁদপুরে এলে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখেন।
এই বাংলো বাড়ির পাখিরা সবাই খাবারের সন্ধানে একত্রে বেড়াতে বের হয় না, পালাক্রমে তারা বের হয়। যার ফলে তাদের কোন না কোন জাত গোষ্ঠী দিনে কিংবা সন্ধারাত পর্যন্ত অবস্থান নেয় এ বাংলো বাড়িতে তাদের বানানো বাসায় নয়তো গাছগুলোর ডালপালায়। তাদের সবরকম খাবারই তারা নিজেরা যোগান দেয়। বিশেষ করে খুব কাছে ডাকাতিয়া আর একটু দূরের বড় দুই নদী পদ্মা মেঘনার ছোট মাঝারি মাছ খেয়ে। আর যাদের মাছ খাওয়ার অভ্যাস নেই, তারা উড়ে বসে চর বা বিলের শয্য ক্ষেতে, শহরের বাসা বাড়ির আঙিনা বা ছাদে।
মজার ব্যাপার হচ্ছে- এই পাখিদের কেউই বিদেশী নন! শীতের আগমন বা পুরো শীতটা জুড়ে সুদূর সাইবেরিয়া থেকে যে পাখিরা চাঁদপুরের পদ্মা মেঘনা ডাকাতিয়ার চর এলাকা চষে বেড়ায়, তাদের কেউই এখানে আসে না, কিংবা আসতে চাইলেও তাদের কোন চান্স দেয় না এখানের দেশীয় পাখিরা। কবে কখন এ পাখিরা এ বাংলোকে ডিসির আবাস্থল হিসাবে বেছে নিয়েছে তা কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারে না। তবে চাঁদপুরের প্রবীণ সাংবাদিক যিনি চাঁদপুর প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন শংকর চন্দ্র দে। বললেন, শত বছরের উপরে। যখন এখানে মহাকুমা প্রশাসকরা (এসডিও) থাকতেন তখনো আমরা দেখেছি এ বাংলো বাড়ি ঘিরে পাখিদের আনাগোনা। জানা গেলো, জেলা প্রশাসকদের কেউ কেউ বিরক্তবোধ করতেন এদের কিচিরমিচিরে। ফলে তারা অনেক বড় গাছের উপরের ডাল কেটে দিতেন যেন বসতে না পারে। কিন্তু ক’দিনের রাগে অভিমানে পাখিদের কেউ কেউ বাইরে থাকলেও আবার ঐ বাংলো বাড়িতে তাদের ফিরে আসা! তবে এখানের এ যাবতের ১৯ জেলা প্রশাসকের বেশির ভাগই পাখি এ বাংলোতে বাস করুক তা চাইতেন।
বর্তমান জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ। এ বছরের জানুয়ারিতে বাংলোয় উঠেছেন। সে মাসের প্রথম ক’দিন এর সংস্কার কাজ চলায় ছিলেন সার্কিট হাউজে। পরে এলেন বাংলোয়। তার বাংলোর পাখি সম্পর্কে তিনি বল্লেন- ওদের দেখতে দেখতে এখন তাদের আমার পরিবারের সদস্যই মনে হয়। এ শত শত পাখি এ বাংলোর অংশীদার বলেই মনে হয় আমার কাছে। ওরা এটিকে তাদের নিরাপদ স্থান মনে করে। জেলা প্রশাসক বলেন, আমার আসা যাওয়ায় ওদের আমি দেখি, বাংলোর মাঠে গিয়ে দেখি। ওদের সকালের হাকডাক, দুপুর বিকেলে গাছের ডালে বসে আলসেমি কিংবা সন্ধা বেলা নীড়ে ফিরা- সবই ভালো লাগার। তিনি বলেন, ওরা এ বাড়ির কিছুই নষ্ট করে না, খাওয়াও চায় না, শুধু একটু আশ্রয়! আর তা-ই যদি না পায় তাহলে দেশীয় পাখিকূল বাঁচানোই তো অসম্ভব। এমনিতেই আমাদের দেশে প্রাকৃতিক ঝড়, অবাধে বৃক্ষ নিধনসহ নানা করানে পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তাই এরা আমার পরিবারের আপন।
তিনি আরও বলেন, এখানে পাখিদের যেন কোন ডিস্টার্ব কেউ না করে সেটি সকল স্টাফদেরকে বলে দিয়েছি।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *