বিশ্ব মানবাধিকার দিবস ও বাংলাদেশ

প্রফেসর ড. মো. লোকমান হোসেন ::
মানবাধিকার বাস্তবায়ন কোনো দেশের ভৌগলিক সীমায় আবদ্ধ নয়। এ অধিকার মানুষের জন্মগত, যা কেউ কেড়ে নিতে পারে না। মানবাধিকার সুরক্ষা ও উন্নয়নে জাতিসংঘ ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর সর্বজনীন ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে। সে থেকে প্রতিবছর ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার দিবসটি পালিত হয়। প্রতিটি মানুষকে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে দিবসটি পালন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আনন্দের। মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তৃণমুল থেকে শুরু করে উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বর্ণাঢ্য র‌্যালি, আলোচনা সভা ও সেমিনারের আয়োজন করা হয়ে থাকে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে দিবসটি নানা আয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে মানবাধিকার বাস্তবায়নের সংস্কৃতির চর্চাকে বেগবান করার উদ্যোগ নেয়া হয়ে থাকে।
আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান তাঁর তারুণ্য থেকেই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও সুরক্ষায় নিরলস কাজ করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে প্রণীত আমাদের সংবিধানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিতকরণের অঙ্গীকার করা হয়েছে যা সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
ইতোমধ্যে মানবাধিকার সুরক্ষায় বাংলাদেশ কর্র্তৃক গৃহীত বেশ কিছু কার্যক্রম আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত হয়েছে। বিশেষ করে মিয়ানমারে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি সংকট মোকাবেলায় দূরদর্শী নেতৃত্ব ও মানবিকতার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মানবতার জননী খেতাবে ভূষিত করা হয়েছে। দেওয়া হয়েছে আইপিএস ইন্টারন্যাশনাল এচিভমেন্ট এওয়ার্ড ও স্পেশাল ডিসটিংশন এওয়ার্ড ফর লিডারশিপ। তাছাড়া পার্বত্য শান্তি চুক্তি, করিডোর বিনিময় কার্যক্রম সম্পাদন, সমুদ্রসীমা নিয়ে দ¦ন্দ্ব-নিরসন ইত্যাদি কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। বাংলাদেশ তিনবার জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের সদস্যপদে নির্বাচিত হয়েছে। মানবাধিকার সুরক্ষার লক্ষ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কনভেনশনে বাংলাদেশ স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করেছে।
বর্তমান সরকার মানবাধিকার রক্ষায় অত্যন্ত আন্তরিক। দেশে আইনের শাসন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ। মানবাধিকার উন্নয়ন ও সুরক্ষার অঙ্গীকার বাস্তবায়নকল্পে সরকার ২০০৯ সালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন প্রণয়ন করে। ইতোমধ্যে কমিশনকে শক্তিশালী করার জন্য জনবল ও বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে কমিশন স্বাধীন এবং নিরপেক্ষভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে রোল মডেল। জাতি, ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেকে নিজ নিজ অধিকার সম্পর্কে সচেতন এবং শ্রদ্ধাশীল। মানবাধিকার সুরক্ষায় তারুণ্যের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত স্বপ্নের উন্নত, সমৃদ্ধ, মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলব। মানবাধিকার দিবসে এই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সবসময় একটি ন্যায় ও সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশে, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭২-এর সংবিধানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সকল মানবাধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সকলের মধ্যে মানবাধিকার সুরক্ষায় সচেতনতা সৃষ্টিতে একযোগে কাজ করে জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ে তুলতে সকলের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা জরুরি।
এক বাণীতে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তিনিও গুতেরেস বলেন, “প্রতিটি স্বতন্ত্র ব্যক্তি তাঁর নাগরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সব অধিকার পাওয়ার যোগ্য। এটি তাঁদের বসবাসের স্থান, বর্ণ, গোষ্ঠী, ধর্ম, সামাজিক উৎপত্তি, লিঙ্গ, যৌন পরিচিতি, রাজনৈতিক অথবা অন্য মতামত, প্রতিবন্ধিতা বা উপার্জন অথবা অন্য যে কোনো অবস্থান নির্বিশেষে প্রযোজ্য।” গুরুত্ব বিবেচনায় প্রত্যেকটি দেশে এ বিষয়গুলো প্রতিপালন করা উচিৎ। নারীর ক্ষমতায়ন, বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার, প্রতিবন্ধীদের ক্ষমতায়ন, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের পুর্নবাসন ও অধিকার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি কাজে বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং বাস্তবায়ন করে চলেছে।
প্রতি পাঁচ বছর পর পর মানবাধিকার-ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য জাতিসংঘ পুরস্কার ও নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া হয়। বর্তমান বিশ্বে দরিদ্রতা ও বঞ্চনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার সমস্যা। যে সকল ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় তা হলো- সামরিক শাসন ও একনায়কতন্ত্র, বন্দিমুক্তি না দেয়া; মিছিল সমাবেশ নিষিদ্ধ করা; মানুষের মৌলিক অধিকার খর্ব করা; রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি হয় এমন কাজ করা; মানবপাচার করা; জোর করে শ্রমিক বানানো; যৌন হয়রানি করা; জোর করে বিয়ে দেয়া; মানব অঙ্গ বিক্রয় করা; মৃত্যুদণ্ড দেয়া; সকলকে সমানভাবে মানবাধিকার ভোগ করার সুযোগ না দেয়া ইত্যাদি।
যে অধিকারসমূহ মানব অধিকার হিসেবে ভোগ করা উচিৎ সেগুলো সম্পর্কে অনেকেই সঠিকভাবে অবগত নয়- বিবাহ, সন্তানলাভ ও পরিবার গঠন; নিজের চাওয়া পূরণ করা; মুক্ত চিন্তা করা; কথা বলার অধিকার; মত প্রকাশের স্বাধীনতা; জনসমাবেশের আয়োজন বা অংশগ্রহণ; গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা; সামাজিক নিরাপত্তা বিধান; শ্রমিকের কাজের অধিকার প্রদান; খাদ্য ও বাসস্থান প্রাপ্তি; খেলাধুলার অধিকার; শিক্ষার অধিকার; অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান পাওয়া; ভোটাধিকার; গোত্রের সমতা; যার যার ধর্ম তার তার; ছুটি ও বিনোদনের অধিকার; শিশুশ্রম বন্ধ করা; সমতাভিত্তিক শিক্ষা পাওয়া ইত্যাদি।
১৯৪৮ সালের জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র নিম্নরূপ : (১) জন্ম থেকেই বেঁচে থাকার সম্মানজনক অধিকার (২) কারো প্রতি কোনো বৈষম্য নয় (৩) স্বাধীন ও নিরাপদ জীবনের অধিকার (৪) কোনো প্রকার দাসত্ব নয় (৫) নিষ্ঠুর নির্যাতন, অবমাননাকর আচরণ নিষিদ্ধ (৬) মানুষ হিসেবে পৃথিবীর সর্বত্র সমান অধিকার (৭) আইনের চোখে সবাই সমান (৮) বিচার আদালতে প্রতিকার লাভের অধিকার (৯) বেআইনিভাবে আটক বা দেশ থেকে নির্বাসন নয় (১০) নিরপেক্ষ বিচার লাভের অধিকার (১১) আদালতে দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ সাব্যস্ত হওয়া (১২) ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষার অধিকার (১৩) নিজ দেশে স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার (১৪) নিজ দেশে নির্যাতিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে ভিন্ন দেশে আশ্রয় লাভের অধিকার (১৫) জাতীয়তা লাভের অধিকার (১৬) বিবাহ এবং পরিবার গঠনের অধিকার (১৭) সম্পত্তির মালিক হওয়ার অধিকার (১৮) ধর্ম, বিবেক ও চিন্তার স্বাধীনতার অধিকার (১৯) মত প্রকাশের স্বাধীনতা (২০) শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ ও সমিতি গঠনের অধিকার (২১) গণতান্ত্রিক অধিকার (২২) সামাজিক নিরাপত্তা লাভের অধিকার (২৩) স্বাধীনভাবে কাজ বেছে নেয়ার অধিকার (২৪) বিশ্রাম ও অবসরের অধিকার (২৫) খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সেবা প্রাপ্তির অধিকার (২৬) সবার জন্য শিক্ষার অধিকার (২৭) মেধাসত্ত্ব সংরক্ষণের অধিকার (২৮) মুক্ত বিশ্বে সকলের অংশীদারিত্বের অধিকার (২৯) অন্যের অধিকার সুরক্ষায় নিজের দায়িত্ব (৩০) মানবাধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারে না।
আসুন আমরা সবার জন্য সর্বত্র মানবাধিকার রক্ষায় সহায়তা করি। মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে সরকারসহ আমরা সবাই মিলে কাজ করি। মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে সরকার আইনগত ব্যবস্থা নেবে, হিংসা-বিদ্বেষ দূর হবে, সুন্দর পৃথিবী গড়ে উঠবে এই হোক আমাদের সকলের প্রত্যাশা।
লেখক: প্রফেসর ড. মো. লোকমান হোসেন, পরিচালক, নায়েম, ঢাকা ।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *