মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য অঙ্গীকার সংস্কার নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা

৩৩ বছর পর ভাস্কর আব্দুল্লাহ খালিদের নামে নামফলক করায় জেলা প্রশাসককে কৃতজ্ঞতা জানালেন শিল্পির পুত্র
চাঁদপুর প্রতিদিন রিপোর্ট :
দীর্ঘদিন যাবৎ সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ অবস্থায় ছিলো চাঁদপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধের দুটি বিশেষ ভাস্কর্য “অঙ্গীকার” ও “রক্তধারা”। বিশেষ করে অঙ্গীকার। এরমধ্যে বিভিন্ন সময়ে অঙ্গীকারের মূল রং এর উপরে চুনকাম ও সাদা রং করে ভাস্কর্যটির ক্ষতি করা হয়েছিল। বিশেষ করে হাসান আলী স্কুল মাঠে ডিসেম্বরে মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের বিজয়মেলা শুরুর প্রাক্কালে এটা হতো। এদিকে ৩৩ বছর আগে শিল্পী সৈয়দ আবদুলাহ খালিদ নির্মিত এ ভাস্কর্যে পলেস্তারা খসে পড়েছিলো, ছিলো না কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অবাধে গরু ছাগল বিচরণ করতো, অঙ্গীকারের দেয়ালের গায়ে বিভিন্ন অপ্রীতিকর ও অশ্লীল কথা লেখা থাকতো। এই ভাস্কর্যটিতে কখনও চুনকাম কখনও সাদা রংয়ের প্রলেপ দেওয়ায় ভাস্কর্যটি হারিয়েছিলো স্বকীয়তা। এ পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অঞ্জনা খান মজলিশ জনপ্রতিনিধি সাংবাদিক, এবং বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষের অনুরোধে এই ভাস্কর্যটি সংস্কারের উদ্যোগ নেন। জানা গেলো, জেলা প্রশাসক চট্রগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনারের কাছ থেকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দুই লাখ টাকার ফান্ডন পান। এরপর এই কাজটি সম্পূর্ণ করার জন্য একটি কমিটিও গঠন করেন তিনি। সেই কমিটির আহবায়ক ছিলেন চাঁদপুর কন্ঠের প্রধান সম্পাদক কাজী শাহাদাত, বিশিষ্ট ছড়াকার ডা. পীযুষ কান্তি বড়ুয়া ও মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান। আহবায়ক কাজী শাহাদত ও ফরিদ হাসান ভাস্কর আনিস আলমকে নিয়ে আসেন এবং জানান, তিনি ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদের ছাত্র। সেই শিল্পী যিনি ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদের ছাএ তাঁর তত্ত¡াবধানে কমিটি এই সংস্কার কাজ সম্পাদন করেন। ভাস্কর আনিস জানান, বিভিন্ন সময়ে চুনকাম এবং রং দেওয়ার কারণে ভাস্কর্যের (অঙ্গীকার) গঠনবিন্যাস বিকৃত হয়ে গেছে যা আর সম্পূর্ণরুপে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
বরং নিতে গেলে এর গঠনগত আরও ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই তিনি এটিকে সাদা রং করেন। সাদা রং দেয়ার কারণ হিসাবে শিল্পী আরো বলেন, তিনি যখন কাজ ধরেন তখনও সেটি বিবর্ন সাদা রং এর ছিল। এভাবেই অঙ্গীকারকে পুনঃসংস্কার করা হয়। কিন্তু কাজ সম্পন্নের পর হঠাৎ করেই দেখা গেলো, এই কাজ ভুল হয়েছে, এর নিজস্ব স্বকীয়তা হারিয়েছে – এমন অভিযোগ এনে স্যোস্যাল মিডিয়াসহ নানাভাবে আলোচনা শুরু করে। হঠাৎ করে তাদের কেউ কেউ এ নিয়ে কিছু না জেনেই চাঁদপুরে শিল্পী আবদুল্লাহ খালিদের ছেলেসহ মানববন্ধন করায়। বিষয়টি জেনে জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিক কমিটির সদস্যদের ডাকেন। এরই মধ্যে মানববন্ধনকারির কয়েকজন এ বিষয়সহ কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করে তাকে স্মারকলিপি পৌঁছাতে যান।
বুধবার দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অঙ্গীকার, বঙ্গবন্ধু পার্ক বিষয়ে যারা মানববন্ধন করেন তারা জেলা প্রশাসকের সাথে সাক্ষাৎ করেন। জেলা প্রশাসক তাদের সাথে কথা বলেন, ভাস্কর্যগুলো সংস্কারের বিষয়ে তাদের সহযোগিতা চান এবং ভাস্কর্যগুলো সংস্কারে তাদেরকে প্রয়োজনে সব ধরনের সহযোগিতা করার কথা জানান। এ বিষয়টি নিয়ে ঢাকায় কথা বলে নিশ্চিত করেন যে, তারা ভাস্কর্যটিকে (অঙ্গীকার) পূনরায় পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবেন। এ সময় জেলা প্রশাসক অভিনেতা, মঞ্চ নির্দেশক, নির্মাতা রামেন্দু মজুমদার ও নির্মাতা নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলেন। তাঁরাও জেলা প্রশাসক কে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। ভাস্কর আব্দুল্লাহ খালিদের ছেলে সৈয়দ আবদুল্লাহ জহী তার পিতার নামে নামফলক করায় জেলা প্রশাসকের প্রতি লিখিতভাবে কৃতজ্ঞতা জানান। সবাই একযোগে চাঁদপুরের ভাস্কর্যগুলো রক্ষার কাজে জেলা প্রশাসককে সহায়তা করবেন মর্মে জানান।
সৌহার্দ্যপূর্ণ এ আলোচনায় জেলা প্রশাসক বলেন, আমি ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। আবদুল্লাহ খালিদ স্যারের সৃষ্টি অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে এবং চারপাশে আমি বিচরণ করেছি। তাঁর একটা সৃষ্টি চাঁদপুরে পড়েছিলো ৩৩ বছর! অথচ তাঁর নামটি নেই। তিনি বলেন, আমি আমার তাড়না থেকেও তার অমর সৃষ্টির প্রতি নজর দিয়েছি। জেলা প্রশাসক বলেন, আপনাদের এখানে আমি তো এসেছি চাঁদপুবাসীর মঙ্গলের জন্যে। তিনি বলেন, আমি যা করি সেটি সবাইকে নিয়েই। এগুলোও কমিটির মাধ্যমেই করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক বলেন, আমাদের মহান, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, জাতির পিতা, মুক্তিযোদ্ধা ও এর যে কোন স্মৃতি ভাস্কর্য এবং মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবার- এ বিষয়গুলো আমার কাছে সর্বাগ্রে প্রাধান্য পাওয়ার এবং সেটা পাবেই। আর এরজন্য চাই সবার সহযোগিতা। তিনি উপস্থিত নাট্যকার, অভিনেতা, প্রযোজক নির্দেশক মাইনুদ্দিন লিটন ভূইয়া, জিয়াউল আহসান টিটো, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিকুল ইসলাম মিন্টু, ভাস্কর্য শিল্পী মিজানুর রহমান সরকারসহ সবাইকে ধন্যবাদ জানান এবং এ ধরনের বিষয়গুলো বা সংশ্লিষ্ট কিছু নিয়ে উনারা যেন তাদের মতামতগুলো প্রশাসনের কাছে তুলে ধরেন। জেলা প্রশাসক বলেন, আমার দরজা সবার জন্য খোলা। যারা সৃষ্টিতে বিশ্বাসী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী তাদের জন্য আমি সর্বদাই নিবেদিত। এখানে জনগনের সেবক হিসাবে কাজ করতে করতে প্রধানমন্ত্রী আমায় পাঠিয়েছেন। সেবার ব্রত নিয়েই আছি থাকবো। পরে সবাই মিলে একটি গ্রæপ ছবি তোলা হয়। এসময় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ইমতিয়াজ হোসেন ও দাউদ হোসেন চৌধুরী, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শানজিদা শাহানাজ, সহকারী কমিশনার আবিদা সিফাত, দেবজানি কর উপস্থিত ছিলেন।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.