হাজীগঞ্জের মোজাফফর হোসেন পাটওয়ারীর মৃত্যু: এক কৃষিপ্রাণ মানুষের বিদায়ে গ্রামীণ ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের অবসান
নিজস্ব প্রতিবেদক: চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার ৪নং কালচোঁ দক্ষিণ ইউনিয়নের নোয়াহটা গ্রামের কৃতী সন্তান,কৃষিপ্রেমী সমাজসেবক ও সবার পরিচিত মুখ মোজাফফর হোসেন পাটওয়ারী (মৃত্যুকালে বয়স প্রায় ৮০ বছর) গত ৮ জুন ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর মৃত্যুতে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, শুভানুধ্যায়ী ও এলাকাবাসীর মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
মরহুম মোজাফফর হোসেন পাটওয়ারীর গ্রামের বাড়ি হাজীগঞ্জ উপজেলার নোয়াহটা গ্রামে। কর্মজীবনে তিনি দেশের স্বনামধন্য ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ফাইজারে দীর্ঘদিন নিষ্ঠা ও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। কর্মস্থল ছিল রাজধানী ঢাকা, তবে গ্রাম, কৃষি ও মাটির প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অসীম।
চাকরিজীবনে অর্জিত অর্থ শহরে সম্পদ গড়ার পরিবর্তে তিনি নিজ গ্রামের কৃষিজমিতে বিনিয়োগ করেন। সপ্তাহজুড়ে ঢাকায় চাকরির ব্যস্ততা থাকলেও ছুটির দিনগুলো তিনি কাটাতেন গ্রামের মাঠে-ঘাটে, কৃষিকাজের তত্ত্বাবধানে। কৃষিকে তিনি শুধুমাত্র জীবিকার মাধ্যম নয়, বরং আত্মতৃপ্তি ও মানবকল্যাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখতেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তিনি ধান, গম, ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন, আলু, কাউন ও তিসিসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষে উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জন করেছিলেন। একই সঙ্গে হাঁস-মুরগি পালন, গবাদিপশু লালন-পালন এবং মাছ চাষের মাধ্যমে সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন। আধুনিক কৃষি বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘ইন্টিগ্রেটেড ফার্মিং’ বলা হয়, তিনি বহু বছর আগেই বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সেই ধারণাকে সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছিলেন।
জীবনের শেষ পর্যায়ে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁর অধিকাংশ কৃষিজমি বর্গা দিতে হয়। বর্তমানে তাঁর সন্তানরা রাজধানী ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তবে তাঁদের পিতার কৃষিনির্ভর জীবনধারার ধারাবাহিকতা নতুন প্রজন্মের মধ্যে আগের মতো বজায় নেই, যা দেশের গ্রামীণ সমাজ ও কৃষি খাতের পরিবর্তিত বাস্তবতাকেও প্রতিফলিত করে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষির প্রতি গভীর অনুরাগ, কর্মনিষ্ঠা, সততা ও আত্মনিবেদনই ছিল মোজাফফর হোসেন পাটওয়ারীর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি চাকরিজীবনের পাশাপাশি কৃষিকে ভালোবেসে গ্রামীণ অর্থনীতি ও খাদ্য উৎপাদনে নীরবে অবদান রেখে গেছেন।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, একজন মানুষের মৃত্যু শুধু একটি জীবনের সমাপ্তি নয়; তাঁর সঙ্গে হারিয়ে যায় বহু স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, মূল্যবোধ ও একটি সময়ের ইতিহাস। মোজাফফর হোসেন পাটওয়ারীর জীবন ছিল ত্যাগ, পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ ও মাটির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
তাঁর মৃত্যুতে আত্মীয়-স্বজন, শুভানুধ্যায়ী ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁরা মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান।
উল্লেখ্য, মরহুম মোজাফফর হোসেন পাটওয়ারীর জীবন ও কর্ম নিয়ে এই স্মৃতিচারণধর্মী লেখাটি প্রস্তুত করেছেন মো. আব্দুল মোতালেব, সহকারী পরিচালক, বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।
মহান আল্লাহ তাআলা মরহুমের সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারকে এই শোক সহ্য করার তাওফিক দান করুন। আমিন।











