হাজীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠায় যাঁদের অবদান আজও স্মরণীয়
শাখাওয়াত হোসেন শামীম :
চাঁদপুরের শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাসে হাজীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ একটি গৌরবোজ্জ্বল নাম।
১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি আজ হাজীগঞ্জ উপজেলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হিসেবে স্বীকৃত। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে কলেজটি হাজারো শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। তবে এ প্রতিষ্ঠানের পেছনে রয়েছে একদল শিক্ষানুরাগী,সমাজহিতৈষী ও দূরদর্শী মানুষের আত্মত্যাগ,নিষ্ঠা এবং নিরলস প্রচেষ্টা।
প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে হাজীগঞ্জ অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। কলেজে পড়াশোনার জন্য শিক্ষার্থীদের দূর-দূরান্তে যেতে হতো,যা অনেক পরিবারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এমন বাস্তবতায় এলাকার শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গ একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন এবং সম্মিলিত উদ্যোগে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেন।
হাজীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠায় যাঁদের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়,তাঁদের মধ্যে রয়েছেন আলহাজ্ব সেকান্দর মিঞা মজুমদার, এসকান্দর মিঞা মজুমদার,আবদুল মতিন মজুমদার,সামছুল হক মজুমদার,আলহাজ্ব নূরুল ইসলাম মজুমদার,আবুল খায়ের মজুমদার,আবুল কাশেম মজুমদার, তাফাজ্জাল হোসেন মজুমদার,দেলোয়ার হোসেন মজুমদার, আলী হোসেন মজুমদার এবং অধ্যাপক জাকির হোসেন মজুমদার। তাঁদের সম্মিলিত উদ্যোগ, সাংগঠনিক দক্ষতা,আর্থিক সহযোগিতা,জমি দান এবং শিক্ষা বিস্তারে অঙ্গীকারের ফলেই প্রতিষ্ঠিত হয় হাজীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ।
বিশেষ করে অধ্যাপক জাকির হোসেন মজুমদার কলেজ প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তৎকালীন সময়ে হাজীগঞ্জে কোনো কলেজ না থাকায় উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের চাঁদপুর বা কুমিল্লায় যেতে হতো। ফলে আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হতো। এই বাস্তবতা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তাই উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করার পর ১৯৬৮ সালে তিনি ঢাকার পেশাগত জীবন ছেড়ে হাজীগঞ্জে ফিরে আসেন এবং একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন।
কলেজটির শিক্ষাকার্যক্রমের সূচনা হয় একটি টিনশেড চৌচালা ঘরে। ১৯৭০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠদান শুরু হলেও প্রতিষ্ঠার পর উপযুক্ত অধ্যক্ষ না পাওয়ায় এলাকাবাসীর অনুরোধে সদ্য স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী জাকির হোসেন মজুমদার প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শিক্ষা বিস্তারের মহান ব্রতকে সামনে রেখে তিনি ১৯৭০ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত কোনো বেতন-ভাতা গ্রহণ না করে কলেজ পরিচালনা করেন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব, একনিষ্ঠ পরিশ্রম ও সাংগঠনিক দক্ষতার ফলে নবীন এ প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে যায়। শিক্ষা উন্নয়নে তাঁর অসামান্য অবদান আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন এলাকাবাসী।
অধ্যাপক জাকির হোসেন মজুমদারের বড় ছেলে ও হাজীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মাহমুদ আহমেদ মিঠু বলেন,“আমার বাবা বিশ্বাস করতেন শিক্ষা মানুষের জীবন পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। হাজীগঞ্জের সাধারণ মানুষ যেন উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়,সেই স্বপ্ন নিয়েই তিনি নিজের উজ্জ্বল রাজনৈতিক ও পেশাগত ভবিষ্যতের অনেক সুযোগ ত্যাগ করেছিলেন।”যে কলেজটি একসময় মাত্র ১০ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল,আজ তা শত শত শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর একটি স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য হাজীগঞ্জ পৌরসভার রান্ধুনীমুড়া এলাকার ঐতিহ্যবাহী মজুমদার পরিবারের সদস্যরা ১৯৬৯ সালের ২২ জুলাই শর্তসাপেক্ষ দান (Conditional Gift) হিসেবে ৫ একর জমি প্রদান করেন। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে বিশিষ্ট সমাজসেবক নন্দলাল সাহা কলেজের সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে আরও ১ দশমিক ৩৩ একর জমি দান করেন। বর্তমানে ৬ দশমিক ৩৩ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা কলেজটি শিক্ষা,সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
শুধু পাঠদান নয়, সমাজ গঠন,সাংস্কৃতিক চর্চা এবং নৈতিক মূল্যবোধ বিকাশেও হাজীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। এ প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য সাবেক শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে কলেজটির সুনাম ও গৌরব বৃদ্ধি করেছেন।
হাজীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের বর্তমান অবস্থানের পেছনে প্রতিষ্ঠাতা,দাতা ও পৃষ্ঠপোষকদের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। শিক্ষা বিস্তারে তাঁদের মহৎ উদ্যোগ,আত্মত্যাগ ও দূরদর্শী চিন্তাভাবনা আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তাঁদের হাত ধরেই হাজীগঞ্জে উচ্চশিক্ষার যে ভিত্তি রচিত হয়েছিল,তা আজ একটি সুদৃঢ়, সমৃদ্ধ ও গৌরবময় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।










