গ্রামে শহরে যেখানেই বাস করি না কেন আসুন বাচ্চাকে ছোট হতেই সাঁতার শেখাই

সাঈদা আক্তার

ঘুম থেকে উঠে মনটা ভালো হয়ে গেল। মায়াবী রোদে চারপাশের সবকিছু হেসে উঠেছে। জীবন সুন্দর। বেঁচে থাকা আরো সুন্দর।   প্রতিদিনের মতো যথারীতি সেজেগুজে স্কুলে পৌঁছালাম।   সালটা মনে হয় ২০০৬ কি ২০০৭ হবে। শিক্ষক মিলনায়তনে   ঢুকার আগেই জেনে গেলাম চরম  কষ্টের একটা খবর। আমাদের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র, রবিউস সানি, রোল ১, বেড়াতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা গেছে । বাবা-মায়ের একটাই ছেলে সানি। একটা বোন আছে তার। স্কুলের আরেক  অভিভাবকের  ভাইয়ের বিয়ে অনুষ্ঠানে  চাঁদপুর থেকে তারা  শরীয়তপুর যায় । ওখানেই অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে গোসল করতে গিয়ে পানিতে ডুবে  মারা গেলো ছেলেটা । ভাবেন একবার!!  একটা আনন্দের অনুভূতি কীভাবে,  কতোটা কঠিন সময় বহন করে আনে মূহুর্তে। কতোটা বিষাদে পরিনত হয়!  প্রায় পনের বছর পরও সে কথা মনে হলে ছেলেটার শিক্ষক হিসেবে  নিজেই  অনেক  কষ্ট পাই,   শ্বাস আটকে আসে।   আর যাদের সন্তান!!!?   মা, বাবার কেমন লেগেছে তখন  বা আজও লাগে?  আরো বেশি কষ্ট বেদনা মৃত্যুর ৪/৫ মাস পরে রবিউস সানির    টেলেন্টপুলে বৃত্তি পাওয়ার খবরটি ।  সেই দিনটা কেমন ছিল?  রোদ, ছিল আকাশ ভেঙে নীলাভ মেঘ। কিন্তু কোন কিছুই হয়তো  তার পরিবারকে স্পর্শ করতে পারিনি। আমাদেরও না!  এ দেশটা  নদীমাতৃক দেশ। নদী, খালবিল, দীঘি পুকুরে ঘেরা। একেবারে জালের  মতো। বর্ষায় এগুলো প্রায় ৩/৪ মাস থাকে পানিতে টইটম্বুর।  তার উপর আছে বন্যা,  অতিবৃষ্টিতে ভীষন রকম জলাবদ্ধতা।  
আমরা সাধারণত  দেখি যে,  গ্রামের  কয়েকটি ঘরের সদস্যরা  মিলেই একটি  বা  বড় বাড়ি হলে ২ টি পুকুর ব্যবহার করে। যেগুলোর চারপাশটাই থাকে অরক্ষিত অবস্থায়।    কতো সহজলভ্য এবং জীবন রক্ষাকারী এইসব জলাধারের গভীর অগভীর পানি যা  মূহুর্তেই হয়ে উঠে সাঁতার না জানা শিশুর জন্য মৃত্যুপুরী !   যা প্রানের উৎস  বলে খ্যাত,  তা- ই আবার  কেড়ে নেয় প্রানটা ! কিন্ত এ তো হওয়ার কথা ছিল না?
এক সমীক্ষায় পেলাম,  বিশ্বে বছরে  ২ লাখ ৩৫ হাজার মানুষ মারা যায় পানিতে ডুবে ।  আর এর মধ্যে ৪০ শতাংশই শিশু।  আর বাংলাদেশে   প্রতিবছর ১৯০০০ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। যেখানে শিশুর সংখ্যাই বেশি।   হয়তো প্রতিদিনের বিক্ষিপ্ত খবর হিসেবে এটা আসে, তাই আমাদের কাছে এটা ভয়াবহ মনে হচ্ছে না।
কিন্তু অদ্ভুত আর আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি হচ্ছে,  এটা করোনা মহামারীর মৃত্যুর চাইতে সংখ্যায় বেশি। দেশে করোনায় ২ বছরে মারা গেছে  ৩০ হাজার। অবাক হলেন!  বিষয় টা হচ্ছে, করোনার ভয়াবহতা একসাথে সবাই জেনেছি। প্রতিদিন একসাথে মৃত্যুর সংখ্যা গননা এবং প্রকাশ হতো। যেটা পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার ক্ষেত্রে হয় না।


বিশ্বে প্রতি বছর  এতো বিপুল সংখ্যক মানুষ মারা যায় যা প্রচন্ড রকম ভয়াবহ বলেই ২০২১ সাল থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২৫ শে জুলাই কে পানিতে ডুবে মারা যাওয়া প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই দিবস ঘোষণাকে আমাকে আপনাকে স্বাগত জানাতেই হবে।
আমার খুব কাছের মানুষের একটা গল্প।  নাম প্রকাশ করলাম না । দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো। মেয়েটা ব্রাহ্মণ আর ছেলেটা মুসলিম । না, প্রেম না। তাদের মাঝে আত্মার অভয়ারণ্যে ভালোবাসা গড়ে উঠেছিল। ছেলেটার চাকুরী হলো। প্রথম মাসের বেতন পেয়ে দু’জন আড়ং থেকে পিতলের দু’টি আংটি কিনল।  পরদিন বন্ধুদের সাথে বান্দরবান বেড়াতে যাওয়ার প্লান। দুপুর থেকে একসাথে তারা। এক হওয়া হবে না জেনেও আংটিটা পড়া ছিল দু’জনের হাতেই। রাতে একসাথে খেয়ে মেয়েটি হলে, ছেলেটা বাস কাউন্টারে। বান্দরবানের থানচিতে নদী পার হতে হয় গাইড এর নেতৃত্বে এবং পরস্পরের হাত ধরে।  কিছু মূহুর্তের অসতর্কতায় ছেলেটা হাত ছেড়ে দিয়েছিল। তিনদিন পর তার ফুলে ফেঁপে ওঠা লাশ উদ্ধার করা হয়। মেয়েটার অনেক আকুতিতে ছেলেটার আঙ্গুলের আংটিটা ( খুলতে গিয়ে গলিত মাংস উঠে এসেছিল) তাকে দেয়া হয়। হয়তো সারাজীবন এটা মেয়েটার কাছে থেকে যাবে। পৃথিবীর সবচেয়ে দামী আর এক পৃথিবী কষ্ট নিয়ে। আমি, আপনি হয়তো পড়লাম, জানলাম কাহিনীটা। কিন্তু অনুভব, হারানোর কষ্ট!!  এসব কী খুব বেশি সময় মনে থাকবে আমাদের? এই লিখা যখন লিখছিলাম, ঠিক তার আগে দৈনিক চাঁদপুর প্রতিদিনের ( ২৮ জুলাই, ২০২৫) প্রথম পৃষ্ঠাতেই প্রকাশ হলো – কচুয়ায় পানিতে ডুবে ২ শিশুর করুন মৃত্যু! একটি দেড় বছরের কন্যা শিশু। তার বাবা গোসল করতে গেলে সেও বাবার সাথে যায় । কিন্তু বাবার চোখের অগোচরে শিশুটি পানিতে ডুবে যায় এবং তাঁর জীবন প্রদীপ নিভে যায়। একই উপজেলার আরেকটি গ্রামে একই দিনে ৩ বছরের আরেক শিশুও পানিতে পড়ে মারা যায়। এ দু’ টো কতোটা হৃদয় বিদারক, তা নিশ্চয়ই আমাদের বুঝার বাকি নাই।
গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের সহযোগিতায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয় ২০২২ সালে পানিতে ডুবে মারা যাওয়া মানুষের মধ্যে ৯৮ শতাংশের বয়সই ১৮ বছরের নিচে। তাদের মধ্যে ৮১ শতাংশের বয়স ৯ বছরের কম। ৬১ শতাংশ শিশুরই ৪ বছর পূর্ণ হয়নি। যে সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৮ শতাংশ বেড়েছে।
শিশু এবং ছোট বাচ্চারা ২ ইঞ্চি পানিতে ডুবে মারা যেতে পারে। কোন শিশু পানিতে পড়ে গেলে তার শ্বাসনালি দিয়ে পানি ফুসফুসে ঢুকে যায় এবং শ্বাসনালি বন্ধ হয়ে শিশু মৃত্যু বরন করে।
ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিস, জন হপকিন্স ইন্টারন্যাশনাল  ইনজুরি রিসার্চ ইউনিট, দি সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বা সি আই পি এবং আইসিডিডিআরবির এক গবেষণায়  বলা হয়েছে, রোগে ভুগে মৃত্যুর চেয়ে দক্ষিন এশিয়ায় পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার বেশি।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আদতে কতোটা সচেতন আমরা? শিশুদের ক্ষেত্রে পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার ঘটনা গ্রাম এবং শহরতলিতে ঘটে বেশি। কারণ হিসেবে, এসব জায়গায় পুকুরের সংখ্যা বেশি এবং সচেতনতার অভাব।
সাধারণত সকাল ৯ টা থেকে দুপুর ১ টার মধ্যে শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু বরন করার বিষয় টা ব্যাপক। এ সময়টাতে বাবা মায়েরা নিজেদের প্রতিদিনের কাজে ব্যস্ত হয়ে যান। শিশুরা দল বেঁধে অথবা একা খেলা করতে করতে কখনো কখনো জলাশয়ের কাছে চলে যায়। তারপর সৃষ্টি হয় মৃত্যুর মতো সমাধানহীন করুন অধ্যায়। সামান্য অসচেতনতা একটা পরিবারের জন্য সারা জীবনের একটি কালো, কষ্টের আর অসীম পথের সূচনা করে। যার পথে হাটতে গিয়ে আপনজনদের মনের গহীনের আলো টুকু খুলে রাখতে হয়।
ভাবুন তো একবার একটা শিশু কতোটা গভীর কষ্ট নিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়। শ্বাস আটকে মারা যায় সে। আমাদের কিছু সচেতনতা হয়তো বাঁচতে সাহায্য করবে এসব অন্ধকারের মতো সমাধানহীন মৃত্যু কে। বিদেশে প্রতিটি স্কুলে সাঁতার শিখানোর ব্যবস্থা আছে প্রায়। অথচ সেখানে নদী, নালার সংখ্যা খুব কম। নদীমাতৃক এ-ই পোড়া দেশে আমরা পারিনি আমাদের শিশুদের সেই সুযোগটুকু করে দিতে। পানিতে ডুবে মারা যাওয়া প্রতিরোধ তো টিকা দিয়ে সম্ভব নয়। দরকার সাঁতার শেখানো। সাধারণ মানুষের মাঝে এ বোধ টুকুন তৈরি করে দিতে হবে আপনার সিদ্ধান্ত আপনার শিশুর নিরাপত্তার বিষয়টি। শিশু তো বড় হবে। এরকম অনেক খবর আমরা পড়ি বেড়াতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে, কলেজ, ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া ছেলে, মেয়েরা। এ দায় কার!  সাঁতার জানা থাকলে অনন্ত আশা তো করা যেতো কিছু সময় সে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যেতে পারতো। বাংলাদেশে মানে আমার দেশে একটা আশার আলো জাগানো একটা খবর হচ্ছে পানিতে ডুবা প্রতিরোধে  সরকারি সহায়তায় জেলায় উপজেলায় শিশুদের সাঁতার  শেখানো প্রকল্প বা কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে । যতোটুকু জেনেছি ৬ জেলা  এর আওতায়। চাঁদপুর এরমধ্যে আছে।  জেলায়  ১ লাখ শিশুকে সাঁতার শেখানো হবে। আসছে সেপ্টেম্বর মাস থেকে এই শিশুরা সাঁতার শিখবে।
এটি একটি ভালো উদ্যেগ!  কিন্তু ২০২৩: সালে সেপ্টেম্বরের দিকে নেয়া এই উদ্যোগটার কতোটুকুন বাস্তবায় হয়েছে বা এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে কিনা তা জানিনা। শুনেছি অনেক জায়গা তথা জেলায় সরকার পর্যায়ে সাঁতার শেখানোর এ প্রকল্পের সাইড সিলেকশনের মধ্যেও কিছু ভুল আছে। যেমন জেলা সদরকে ছাড়িয়ে এসব করা হয়েছিলো অন্য উপজেলা পর্যায়ে। হ্যাঁ, এটি গ্রামিন পর্যায়ে এটি থাকবে, কিন্তু এর বড় কাজটা জেলা শহরে থাকা দরকার। চাঁদপুরও বোধকরি এরকম হয়েছে। অর্থাৎ জেলা সদরকে প্রাধান্য দেয়া হয়নি। এখন বিষয়টিকে অনুধাবন করে বোধকরি জেলা সদরে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে । হ্যাঁ, গ্রামিন জনপদ থেকেই বেশি খবর আসে পানিতে ডুবে যাওয়া শিশুর মৃত্যুর খবর! কিন্তু শহর এলাকার শিশুর জন্য তো পানিতে নামার ব্যবস্থা নেই বল্লেই চলে , তাই তাঁকে সাঁতার শেখানোর ব্যবস্থাটাও থেকে যায় সুপ্ত। তবে এই বিপুল সংখ্যক বাস করা শিশু সাঁতার শেখা অতীব জরুরি। এই শিশুদের সাঁতার না জানার বেদনার শব্দ শুনা যায় যখন তারা গ্রামে নিজের বাড়ি কিংবা অন্য কোথাও বেড়াতে যায়। যেমন সাগর কিংবা নদী এলাকা ঘুরতে যায়।

আমরা দেখছি বিপুল সংখ্যক পানিতে ডুবার মধ্যে শিশুই ৯৫ শতাংশের উপরে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন,  এর সংখ্যা দিনদিন বাড়ছেই।  প্রতিদিনই সংবাদপত্রের পাতায় চোখ রাখলেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর আমরা দেখতে পাই। দেখতে পাই ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোতেও। আরেকটা উদহারন দিয়ে শেষ করি!
২০২৩ সালে মুন্সিগন্জে একটা ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটে গেলো।  ঐ ঘটনায়  ১১ জন পানিতে ডুবে মারা যায়। তার মধ্যে শিশুই ছিলো ৮ জন!  সাংবাদিকরা বলছেন,  এই শিশুদের কেউই সাঁতার জানতো না!  ফলে তারা খুব অল্প সময়ের মধ্যে মারা যায় । এমন শত শত দুর্ঘটনাতে সাঁতার না জানা শিশুগুলো বড় অসহায়বোধ করে। বেঁচে থাকার কোন অবলম্বন বড়দের মাঝে কিছু আশা জাগালেও নরম, কোমল শিশুগুলো মৃত্যুর রঙে রঙিন হয়ে যাওয়ার অপেক্ষা করে। সাঁতার না জানার কারনে সে  হাত পা বা মুখ তুলে ইশারাটাও করতে পারে না!  খুব অল্প সময়েই তলিয়ে যায় পানিতে।  হ্যাঁ, শেষ সংবাদ পেলাম চাঁদপুর সদরসহ ৩ উপজেলায় সাঁতার শেখানো শুরু হয়েছে। তাগিদ ছিলো চাঁদপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিনের। সদর উপজেলা পুকুরে এ মাস থেকে শুরু হয়েছে শিশুদের সাঁতার শেখানো। অনেক ভালো একটা সংবাদ।
লেখার সমাপ্তি টানার আগে বিশেষ অনুরোধ রাখছি – আসুন টিকা কর্মসূচি সফল করার মতো বাচ্চাদের সাঁতার শেখানো কার্যক্রম সফল করি। গ্রামে,  শহরে যেখানেই বাস করি না কেন    বাচ্চাকে ছোট হতেই সাঁতার শেখাই। সচেতন হই নিজের জন্য, নিজের সন্তানের জন্য।


লেখক পরিচিতি : —
সাঈদা আক্তার
প্রাক্তন শিক্ষক
উদয়ন শিশু বিদ্যালয়, চাঁদপুর ।

শেয়ার করুন