শবে বরাত: ক্ষমা, রহমত ও তাকওয়া অর্জনের মহিমান্বিত রজনী

✦ মুফতি মাওলানা মুহাম্মাদ জাহিদুল ইসলাম ছালেহী 

পরিচালক, দারুচ্ছুন্নাত হুসাইনিয়া দীনিয়া একাডেমী চাঁদপুর।

খতিব,আল আমিন জামে মসজিদ। 

আল্লাহ তাআলা মানবজাতির কল্যাণের জন্য কিছু বিশেষ সময় ও মুহূর্ত নির্ধারণ করেছেন, যেগুলোতে তাঁর রহমত অবতরণ হয়, গুনাহ ক্ষমা করা হয় এবং বান্দার দোয়া কবুল হয়। তন্মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রজনী হলো শবে বরাত—যা মুসলিম উম্মাহর নিকট “লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান” নামে পরিচিত।

শবে বরাতের অর্থ ও পরিচয়

‘শবে বরাত’ শব্দটি ফারসি। ‘শব’ অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ অর্থ মুক্তি, নাজাত বা পরিত্রাণ। অর্থাৎ এটি এমন এক রাত, যেদিন আল্লাহ তাআলা অসংখ্য বান্দাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দান করেন।

আরবিতে এ রাতকে বলা হয়:

لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ

অর্থ: শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাত।

কুরআনের আলোকে মহিমান্বিত রজনী

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ

“নিশ্চয়ই আমি এটি অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রাতে।”

(সূরা আদ-দুখান: ৩)

অনেক মুফাসসির বলেন, এখানে বরকতময় রজনীর দ্বারা শবে বরাতের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে, যেখানে বান্দার তাকদীর সংক্রান্ত ফয়সালা লিখা হয়।

আরও বলা হয়েছে—

فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ

“এই রাতে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ফয়সালা করা হয়।”

(সূরা আদ-দুখান: ৪)

হাদিসে শবে বরাতের ফজিলত

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন—

إِنَّ اللَّهَ يَطَّلِعُ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِجَمِيعِ خَلْقِهِ إِلَّا لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ

“শাবানের মধ্যরাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর সমস্ত সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।”

(ইবনে মাজাহ: ১৩৯০, তাবরানী)

আরেক হাদিসে এসেছে—

“এই রাতে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের ক্ষমা করেন, রহমত বর্ষণ করেন এবং অসংখ্য মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করেন।”

(বায়হাকী)

হযরত আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“আল্লাহ তাআলা শা‘বানের মধ্যরাতে (শবে বরাত) দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং বনু কালব গোত্রের বকরীর পশমের সংখ্যার চেয়েও অধিক লোককে ক্ষমা করে দেন।”

সুনানে তিরমিযী — হাদীস নং: 739

শবে বরাতে করণীয় আমল

১. নফল নামাজ আদায়

রাত জেগে ইবাদতে মশগুল থাকা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।

২. কুরআন তিলাওয়াত

আল্লাহর কালামের মাধ্যমে অন্তর পরিশুদ্ধ হয়।

৩. বেশি বেশি ইস্তিগফার

أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الْعَظِيمَ

গুনাহ মাফের উত্তম মাধ্যম।

৪. দোয়া ও মুনাজাত

নিজ, পরিবার ও উম্মাহর জন্য দোয়া করা।

৫. পরদিন রোজা রাখা

রাসূল ﷺ শাবান মাসে অধিক রোজা রাখতেন।

(সহিহ বুখারী)

৬. কবর জিয়ারত করা।

কেননা হাদীস শরীফে এসেছে 

হযরত আম্মাজান  আয়েশা সিদ্দীকা রাঃ বলেন,

“এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে ঘরে পাইনি। আমি বের হয়ে তাঁকে জান্নাতুল বাকীতে পেলাম। তিনি বললেন:

‘তুমি কি আশঙ্কা করছ যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার প্রতি জুলুম করবেন?’

আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! আমি ভেবেছিলাম আপনি অন্য কোনো স্ত্রীর কাছে গেছেন।

তখন তিনি বললেন:

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা শা‘বানের মধ্যরাতে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং বনু কালব গোত্রের বকরীর পশমের সংখ্যার চেয়েও অধিক লোককে ক্ষমা করে দেন।’”

সুনানে ইবনে মাজাহ

যেসব কাজ থেকে বিরত থাকা জরুরি

❌ আতশবাজি, ফানুস উড়ানো

❌ কবরকে কেন্দ্র করে বিদআত

❌ অনৈসলামিক অনুষ্ঠান

❌ সারা রাত আড্ডা ও অপচয়

শবে বরাতের মূল শিক্ষা

✔ তাওবা ও আত্মশুদ্ধি

✔ অহংকার ও হিংসা পরিত্যাগ

✔ সম্পর্কের জট খুলে ফেলা

✔ তাকওয়াপূর্ণ জীবন গঠন

বর্তমান সমাজে শবে বরাতের তাৎপর্য

আজ সমাজে অশ্লীলতা, হিংসা, দুর্নীতি ও জুলুম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। শবে বরাত আমাদের শেখায় আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন। কিন্তু কিছু মানুষ আছে এই রাতে মসজিদে যেতে বাঁধা দেয় তারা বিদয়াতের ফতুয়া দেয় কিন্তু মোটেও বিষয়টি বেদআত নয়, এই রাতের ইবাদত নিঃসন্দেহে সুন্নাত।  এই রাতের উছিলায় বহু পাপী তাপিকে আল্লাহ তায়ালা এই রাতের বরকতে মাফ করবেন। যারা সাড়া বছর মসজিদে আসে না কিন্তু এই রাতে এসে আল্লাহ তায়ালা কে সিজদা দেয় এটাতো ভালো দিক নেকের কাজ এই উছিলায় হতেও পারে আল্লাহ তায়ালা তাকে খাঁটি মমিন হিসেবে কবুল করবেন।

শেষ কথা

শবে বরাত কোনো উৎসবের রাত নয়, এটি কান্না, ক্ষমা প্রার্থনা ও আত্মগঠনের রাত। আসুন, আমরা এই মহিমান্বিত রজনীকে যথাযথভাবে কাজে লাগাই।

আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সবাইকে শবে বরাতের পূর্ণ বরকত ও মাগফিরাত নসিব করেন। আমিন।

শেয়ার করুন