দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সেলিম খানের মামলার আবেদন খারিজ আদেশে আদালতের পর্যবেক্ষণ

* প্রকাশিত সংবাদ সাংবাদিকরা নিজে থেকে বানিয়ে প্রকাশ করেছেন মর্মে দৃষ্ট হয় না
* পদ্মা-মেঘনা নদী রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশ রক্ষা, জাতীয় সম্পদ ইলিশের অভয়ারণ্য ও অভয়াশ্রমের নিরাপদ সুরক্ষাসহ সর্বোপরি এ অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে সরল বিশ্বাসে প্রকাশিত বলে মনে করেন আদালত
* চাঁদপুর থেকে অন্যকে দিয়ে মামলা করার যৌক্তিক কারণ উল্লেখ করেননি সেলিম খান
চাঁদপুর প্রতিদিন রিপোর্ট :
চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি, দৈনিক চাঁদপুর প্রতিদিনের সম্পাদক ও প্রকাশক এবং দৈনিক সমকালের চাঁদপুর প্রতিনিধি, সিনিয়র সাংবাদিক ইকবাল হোসেন পাটওয়ারী এবং চাঁদপুর প্রতিদিনের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সিনিয়র সাংবাদিক ইব্রাহিম রনি’র বিরুদ্ধে ল²ীপুর মডেল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সেলিম খানের করা মামলা খারিজ করেছেন মহামান্য আদালত। গত ২২/০৩/২০২২ইং তারিখে আমলী আদালত চাঁদপুর সদরে করা এই মানহানির মামলায় আদালতের বিজ্ঞ বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ কামাল হোসাইন মামলাটি শুধু খারিজই করেননি, এই আদেশের পর্যালোচনা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে মনে করেন আইনজ্ঞরা। এছাড়া এই আদেশ যে কোন সাংবাদিককে মুক্ত স্বাধীন ও সুষ্ঠ সাংবাদিকতায় একটি মাইলফলক।
বিজ্ঞ আদালত আদেশের পর্যালোচনায় উল্লেখ করেন, ফরিয়াদির বাদী পক্ষে মূল বক্তব্য তিনি শুনেছেন এবং যাবতীয় কাগজপত্রাদি পর্যালোচনা করে উল্লেখ করেন মামলার নং সাক্ষী সেলিম খান ল²ীপুর মডেল ইউনিয়ন পরিষদের একজন চেয়ারম্যান। ফরিয়াদির জবানবন্দীতে এবং নালিশে উল্লেখ করেন ১নং আসামী ইকবাল হোসেন পাটওয়ারী তার সম্পাদকীয় দৈনিক চাঁদপুর প্রতিদিন পত্রিকায় ‘২০১৫ সাল থেকে পদ্মা-মেঘনা নদী থেকে যত্রতত্র পরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রি করে আসছে, ইউপি চেয়ারম্যান সেলিম খানের একটি চক্র’। এ সংবাদ প্রকাশ করে ১নং সাক্ষী সেলিম খানের মতো একজন সম্মানিত মানুষের ৫০ কোটি টাকার মানহানি করেছেন মর্মে দাবি করেন। এর আলোকে বিচারক আরো উল্লেখ করেন, নালিশের ভাষ্যমতে ১নং সাক্ষী সেলিম খান মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের রিটের আদেশ এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরণীন নৌ পরিহন কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত নির্ধারিত মৌজায় বালু উত্তোলন করেন মর্মে দাবি করলেও সেলিম খান অনুমোদিত মৌজায় ম্যাপ উল্লেখ করেন নাই।
অপরদিকে ১নং সাক্ষীর সাক্ষরিত ২২/০৩/২০২২ইং তারিখে বাদীর অনুকূলে মামলা দায়ের ও পরিচালনার ক্ষমতাপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ওই নালিশটি আদালতে একই তারিখে দায়ের করা হয়। এতে আদালতের কাছে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়েছে যে, মামলা দায়েরকালে ১নং সাক্ষী তথা সেলিম খান চাঁদপুর জেলায় অবস্থান করেন। কিন্তু অবস্থান করলেও তিনি সশরীরে আদালতে হাজির না হয়ে ফরিয়াদির মাধ্যমে মামলা দায়ের করার আইনানুগ যুক্তি উল্লেখ করেন নাই। বিচারক আদেশে আরো উল্লেখ করেন, ফরিয়াদির নালিশী বক্তব্য এবং পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের শিরোনামসহ পুরো রিপোর্ট আদালত পর্যালোচনা করেছে। ঐ পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে গত ২১ মার্চ ২০২২ চাঁদপুর জেলা শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠকে চেয়ারম্যানের বক্তব্য এবং মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোঃ হারুনুর রশিদের দেয়া চিঠিতে উল্লেখ করা হয় ‘চাঁদপুরের উপর দিয়ে প্রবাহিত মেঘনা নদীতে ড্রেজারের মাধ্যমে গত কয়েক বছর ধরে অপরিকল্পিতভাবে যততত্র বালু উত্তোলন করা হচ্ছে’। তাতে দেখা যায় আদালতের বিচারক উপরোক্ত বিষয়ে পর্যালোচনা করে বলেন, পত্রিকার সম্পাদক জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানের বক্তব্য এবং মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার দেয়ার চিঠির কথাই সংবাদ হিসেবে পরিবেশন করেন। প্রকাশিত সংবাদপত্রে সম্পাদক ও প্রকাশক এবং রিপোর্টার নিজের থেকে বানিয়ে কথা প্রকাশ করেছেন মর্মে দৃষ্ট হয় না। আদালতের বিজ্ঞ বিচারক আদেশে উল্লেখ করেন, সংবাদটি সারমর্ম পড়ে পদ্মা-মেঘনা নদী রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশ রক্ষা, জাতীয় সম্পদ ইলিশের অভয়ারণ্য ও অভয়াশ্রমের নিরাপদ সুরক্ষাসহ সর্বোপরি এ অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে সরল বিশ্বাসে প্রকাশিত বলে মনে করি। বিচারক আরো উল্লেখ করেন যে, এই বিষয়ে আমাদের মহামান্য উচ্চ আদালতের একটি সিদ্ধান্ত উল্লেখের দাবী রাখে।

“A Publication in newspaper of facts which can be rfeasonably believed tb be true, or which can be inferred from the circumstances, does not amount to any offence under the section 499.” Khondkar Abu Taleb vs State 19DLR(SC) 198.

আদেশের পরিশেষে উল্লেখ উপর্যুক্ত আলোচনা ও সিদ্ধান্ত পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, অত্র মামলায় আসামীগণের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা প্রতিভাত (প্রতিফলন) হয়নি। ফলে ততপ্রেক্ষিতে অত্র নালিশী অভিযোগটি ২০৩ ধারায় খারিজযোগ্য এবং আদেশ হচ্ছে যে অভিযোগটি ফৌজদারী কার্যবিধি ১৮৯৮ এর ২০৩ ধারায় খারিজ করা হলো।
উল্লেখ্য, সেলিম খান এই মামলা করেই ক্ষান্ত হননি, পরের দিনই একই রকম বর্ণনা করে এই দুই সাংবাদিকসহ ৬ জন সাংবাদিককে লিগ্যাল নোটিশ পাঠান। আদালতের এই দৃষ্টান্তকারী আদেশের পর বিবাদী সাংবাদিক ইকবাল হোসেন পাটওয়ারী গত ২৪/০৩/২০২২ সেলিম খানের বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগ এনে লিগ্যাল নোটিশ পাঠান। অপ্রিয় হলেও সত্য, ওই লিগ্যাল নোটিশের উত্তর না দিয়ে প্রভাবশালী সেলিম খান গত ২৭/০৩/২০২২ ইকবাল হোসেন পাটওয়ারীর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় লিগ্যাল নোটিশ পাঠান। যা রীতিমত সাংবাদিককে বিস্মিত করেছে। শুধু তাই নয় এ লিগ্যাল নোটিশ স্থানীয় একাধিক পত্রিকায় তিনি প্রকাশ করেছেন। আইনজ্ঞরা বলছেন, এমন ধরনের লিগ্যাল নোটিশ জারি করা তারই সাজে যারা আইনের বিষয়ই অবগত নন।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.